বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত মুদ্রার জন্মস্থানে...

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-১২ ১১:৩৩:৩১
image

মার্কিন ডলার বর্তমান বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত মুদ্রা। এটা মূলত বৈশ্বিক টেন্ডার ও স্বর্ণের মানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যমতে, বিশ্বের আর্থিক রিজার্ভের ৬২ শতাংশ ডলারে সংরক্ষিত আছে; যা ইউরো, ইয়েন ও রেনমিনবির দ্বিগুণেরও বেশি। ৩১টি দেশ ডলারকে সরকারি মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করছে বা তাদের অর্থের নামকরণ করেছে। ৬৬টিরও বেশি দেশ তাদের মুদ্রার মানদণ্ড হিসেবে ডলারকে বিবেচনা করে। এটা এখন উত্তর কোরিয়া, সাইবেরিয়া ও উত্তর মেরুর গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মতো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে গ্রহণযোগ্য।

 

তবু পৃথিবীতে এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে ডলার গৃহীত হয় না। ইউরোপের চেক রিপাবলিকের ছোট্ট শহর জ্যাকিমোভ, যেখানে ডলার মূল্যহীন। বোহেমিয়ার ক্রুন হরি পর্বতমালার কাঠের ভাঁজগুলোতে গভীরভাবে আঁকানো, ৫০০ বছর আগে ১৫২০ সালের জানুয়ারিতে এখানেই ডলারের উদ্ভব হয়েছিল। চেক-জার্মান সীমান্তের কাছে ২ হাজার ৭০০ মানুষের শহর জ্যাকিমোভ ডলারের বাড়ি (উদ্ভব) হলেও সেখানেই ডলার মূল্যহীন। পৃথিবীর এমন অদ্ভুত জায়গা সম্পর্কে আপনি জানেন না, এটা নিশ্চিতভাবেই ধারণা করা যায়। জ্যাকিমোভের ক্রুন হরি বা অর পর্বতমালাকে ইউনেস্কো নতুন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।

 

বাস্তবে আপনি জ্যাকিমোভের রাস্তায় হাঁটলে, পাহাড়ে উঠলে, উপত্যকার পাদদেশে ঘুরলে বা ১৬ শতকের প্রাসাদে ঘুরে বেড়িয়ে কখনই বুঝতে পারবেন না এটা ডলারের জন্মস্থান। ‘কীভাবে জানবেন? না আছে কোনো চিহ্ন, নাআছে কোনো বিজ্ঞাপন; বেশির ভাগ মানুষ বিষয়টা জানেও না’, বলছিলেন মাউন্টেন রিজিওন ক্রস হরি-অ্যাজগিবিগারের পরিচালক মিশেল আরবান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোনো মাইনিং শহরে জ্যাকিমোভের মতো এত বড় প্রভাব পড়েনি, আমরা আমাদের ইতিহাস ভুলে গিয়েছি।’

 

জ্যাকিমোভের অস্তিত্বের অনেক আগে নেকড়ে ও ভল্লুকরা ওখানকার পাহাড়গুলো শাসন করত। ১৫১৬ সালে যখন বিপুল পরিমাণ রৌপ্যের সন্ধান পাওয়া যায়, তখন স্থানীয় অভিজাত বংশীয় হিয়ারনামাস শ্লিক ওই স্থানকে জোকিমিস্থল বা যিশুখ্রিস্টের পিতামহ ও মাতা মেরির পিতার নামে ‘জোয়াকিম ভ্যালি’ হিসেবে নামকরণ করেন। স্থানীয় ইতিহাসবিদ জারোস্লাভ ওচেক ব্যাখ্যা করেন, ‘সে সময় ইউরোপ ছিল নগর রাজ্যগুলোর একটি মহাদেশ। তাদের মধ্যে আর্থিক কোনো মানদণ্ড ছিল না। অর্থ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে একটি ছিল মুদ্রার প্রচলন করা। শ্লিক ঠিক এ কাজটাই করেছিলেন।’

 

বোহেমিয়ান ডায়েটের সরকার ১৫২০ সালের ৯ জানুয়ারি শ্লিককে আনুষ্ঠানিকভাবে রৌপ্য মুদ্রা প্রচলনের অনুমতি দিয়েছিলেন। মুদ্রাটির সামনের পাশে জোয়াকিম এবং পেছনের পাশে সিংহের একটি চিত্রকে স্ট্যাম্প করা হয়েছিল এবং নতুন মুদ্রার নাম দেয়া হয়েছিল ‘জোয়াকিমসথেলারস’, যা শিগগিরই ছোট আকারে ‘থেলার’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সে সময় ধাতবসামগ্রীর কয়েনগুলো একমাত্র মূল্য নির্ধারক ছিল। শ্লিক ‘থেলার’ মুদ্রা ছড়িয়ে দিতে এবং বাঁচিয়ে রাখতে দুটো স্মার্ট কাজ করেছিলেন। প্রথমে তিনি থেলারকে ২৯ দশমিক ২ গ্রাম গুল্ডেগ্রোসচেনের মুদ্রার মতো একই ওজন ও ব্যাসের তৈরি করেছিলেন, যা মধ্য ইউরোপের বেশির ভাগ অংশে ব্যবহার হতো। এ কাজ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর পক্ষে এ মুদ্রাকে গ্রহণ করা আরো সহজ করে তুলেছিল। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তত্কালীন বিশ্ব যত মুদ্রা দেখেছে, তার চেয়েও তিনি বেশি মুদ্রা তৈরি করেছিলেন।

 

মাত্র ১০ বছরের মধ্যে জোয়াকিম ভ্যালি ১ হাজার ৫০ ব্যক্তির জনপদ থেকে ইউরোপের বৃহত্তম খনিজ কেন্দ্রে রূপান্তর হয়। হাজারের বেশি খনি আবিষ্কার হয় এবং হাজার হাজার খনি শ্রমিক সেখানে কাজ শুরু করে। খনির এমন কাজের মধ্য দিয়ে অনুমান করা হয়েছিল ১২ মিলিয়ন থেলার মুদ্রা ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যা মহাদেশের অন্যান্য মুদ্রার চেয়ে অনেক বেশি। মিশেল আরবান বলেন, ‘পরবর্তী ৩০০ বছর পুরো ইউরোপের পাশাপাশি বিশ্বের অনেক দেশেই থেলার মুদ্রা বিস্তৃত আকারে ব্যবহার হতে থাকে। শিগগিরই থেলার এখান থেকে অনেক দূরে নিজস্ব জীবনযাপন শুরু করে।’

 

ইউরোপের শাসকরা থেলার মুদ্রাগুলো পুনরায় তৈরি করতে শুরু করেছিলেন এবং তারা সেগুলোকে নিজস্ব ভাষায় নামকরণও করেছিলেন। ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেনে থেলার মুদ্রা ‘ডেলার’ হিসেবে পরিচিতি পায়। আইসল্যান্ডে এটা ছিল ‘ডেলুর’। ইতালিতে ‘তেলেরো’। ফ্রান্সে এটা ছিল ‘জোকানডেল’। থেলার শিগগিরই আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এটা ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে ইথিওপিয়া, কেনিয়া, মোজাম্বিক ও তানজানিয়ায় ব্যবহার হয়েছিল। এছাড়া আরব উপদ্বীপের বেশির ভাগ অংশ এবং ভারতে বিশ শতকে এটা প্রচলিত ছিল। ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্লোভেনিয়ার সরকারি মুদ্রা ছিল ‘টলার’। সামোয়াতে এখন পর্যন্ত এটাকে ‘টালা’ বলা হয় এবং রোমানিয়া (লেউ), বুলগেরিয়া (লেভ) ও মালদোভিয়ায় (লেউ) মুদ্রাগুলো আজ পর্যন্ত ৫০০ বছর আগের সিংহের স্ট্যাম্পযুক্ত থেলার মুদ্রার নাম গ্রহণ করে আছে। সবশেষ ডাচ ‘লিউউইনডালার’, ‘সিংহ ডলার’ বা সংক্ষিপ্ত ‘ডেলার’, যা ইংরেজিতে ‘ডলার’ হিসেবে উচ্চারিত হয়েছিল। এটাই মার্কিন মুদ্রার নাম হয়েছে।

 

প্রথমে ডাচ উপনিবেশবাদীদের সঙ্গে সতেরো শতকে নিউ আমস্টারডামে পৌঁছানোর পর ডেলার দ্রুত ১৩ কলোনিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইংরেজিভাষী ঔপনিবেশিকরা সেটাকে ডাকতে শুরু করে। একইভাবে সব ভারী রৌপ্য মুদ্রা, বহুল ব্যবহূত স্প্যানিশ ডি এ ওচা কয়েন ‘ডলার’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৭৯২ সালে ডলার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মুদ্রায় পরিণত হয় এবং তখন থেকেই থেলার অনুপ্রাণিত ডলার অস্ট্রেলিয়া, নামিবিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিজির মতো দেশে তার পদযাত্রা অব্যাহত রেখেছে।

 

জ্যাকিমোভে যখন চকচকে রৌপ্যের মজুদ হ্রাস পেয়েছে, তখন খনি শ্রমিকরা একটি রহস্যময় পিচ-কালো রঙের পদার্থের মুখোমুখি হতে শুরু করেছিল, যা মারাত্মক ফুসফুস রোগ সৃষ্টি করে। তারা ইউরেনাইট মিনারেলকে ‘পেসব্লেন্ডে’ বা দুর্ভাগ্য বলে অভিহিত করে। ১৮৯৮ সালে শহরের খনিগুলো চালনার সময় ম্যারি কুরি নামে একজন পদার্থবিজ্ঞানী শনাক্ত করেন একই আকরিক, যা দিয়ে প্রথম ডলার তৈরি করা হয়েছিল, সেটাতে দুটি নতুন তেজস্ক্রিয় উপাদান রয়েছে—রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম। এ আবিষ্কারের ফলে প্রথম নারী হিসেবে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। তবে এটি আরো একটি বিষয়ের সূচনা করেছিল, পারমাণবিক লড়াই। পরবর্তীতে জ্যাকিমোভে ডলার বিলুপ্ত হয়।

 

মাউন্টেন রিজিওন ক্রস হরি-অ্যাজগিবিগারের পরিচালক মিশেল আরবান বলেন, বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এখানে বসবাসকারী মানুষজন প্রথম ডলার তৈরির জন্য গর্ববোধ করত। কিন্তু যখন জনসংখ্যার পরিবর্তন ঘটে, তখন এ ইতিহাস ক্রমেই হারিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে রাশিয়াকে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে সহায়তার জন্য খনিগুলো কাজে লাগানো হয়।

 

তিনি বলেন, পারমাণবিক বোমার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর প্রায় ৫০ হাজার সোভিয়েত রাজনৈতিক বন্দিদের জ্যাকিমোভে পাঠানো হয়। তাদের দিয়ে পারমাণবিক জ্বালানির জন্য ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ইউরেনিয়াম খনন, চূর্ণ ও ভর্তি করার কাজ করানো হয়। আধুনিক বিশ্বের দুটি শক্তিশালী প্রতীক ডলার ও পারমাণবিক অস্ত্র এ জ্যাকিমোভ শহর থেকেই এসেছে।

 

ডলারের জন্মস্থান হিসেবে জ্যাকিমোভে কোথাও কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই। তবে আপনি যদি শহরের রয়্যাল মিন্ট হাউজ জাদুঘরে যান এবং সেখানকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঐতিহাসিক গল্পে বসেন, তবেই আপনি ইতিহাসটা জানতে পারবেন। 

সূত্র: বিবিসি, ভাষান্তর: শিহাবুল ইসলাম