রবিবার, নভেম্বর ২৯, ২০২০

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন : আমেরিকার কাছ থেকে যা যা পেতে চায় বাংলাদেশ

  • আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক
  • ২০২০-১০-২০ ২৩:০৮:৩০
image

অর্থনৈতিক শক্তি আর সামরিক সক্ষমতার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা কিংবা গতিপ্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কাল থেকেই বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বা অবস্থান নিয়ে নানা ধরণের আলোচনা আছে বাংলাদেশে।
কিন্তু নির্বাচনে যে প্রার্থীই বিজয়ী হোন না কেন বাংলাদেশ কি চায় বা কি পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দেশটির সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
যদিও এ বিষয়ে তারা একমত যে, বাংলাদেশের জন্য সেখানে কোন দলের কে বিজয়ী হলো তা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি হুট করে পরিবর্তন করে না।
দু’দেশের নীতির ক্ষেত্রে অনেক সময় পারস্পারিক মতভিন্নতা দেখা গেলেও সার্বিকভাবে তা বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক কিছু নয় বলেই মনে করেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, আমেরিকার কাছ থেকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ যা পেতে পারে তা হলো বাণিজ্য ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে দেশটির শক্ত অবস্থান, রফতানি ক্ষেত্রে সুবিধার পাশাপাশি ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট এবং বৈধ অভিবাসনে আরো উদারতা।
‘গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকারের মতো ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আপত্তি করে। কিন্তু তাদের অবস্থান কখনো বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল হয়নি। জিএসপিটা হয়তো আপাতত দেবে না । তবে এটিই হতে পারতো বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি। এখন ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টটা যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে বাংলাদেশ শুরু করতে পারলেও সেটি ইতিবাচক হবে,’ বলছিলেন তিনি।
আর সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে বাংলাদেশকে আরো সহায়তা করুক যুক্তরাষ্ট্র, এটিই সর্বাগ্রে চাওয়া থাকবে বাংলাদেশের।
‘দক্ষিণ এশিয়ায় যে কৌশলগত অবস্থানের কথা যুক্তরাষ্ট্র বলছে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন গুরুত্ব পাক ও বাংলাদেশের উন্নয়নে আরো বেশি বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসুক তারা – এটিই বাংলাদেশ চাইছে,’ বলছেন তিনি।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে আগেই এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য আছে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা)।
দু’দেশের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি
মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বিপক্ষে থাকলেও সেখানকার সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের ব্যাপক সমর্থন ছিলো বাংলাদেশের প্রতি, যার জের ধরে স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র।
দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় চার মাস পর ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং এরপর থেকে গত ৪৮ বছরে দু’দেশের সম্পর্ক অনেক দূর এগিয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রই এখন এককভাবে বড় দেশ।
আবার এ মুহূর্তে বাংলাদেশে আসা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবের পরেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের প্রথম দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিলো ১৯৭২ সালের মে মাসে, যার অধীনে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সাহায্য বিভিন্ন পর্যায়ে পেতে শুরু করেছিলো। এরপর বিভিন্ন সময়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদারই হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিল ক্লিনটন বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০০০ সালের মার্চ মাসে। পরে ২০১২ সালে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একটি কৌশলগত চুক্তি হয়। বাংলাদেশে তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত দু’দেশের সম্পর্ককে ‘স্পন্দনশীল, বহুমুখী ও অপরিহার্য’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
আবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অনুরোধে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে কসভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গণতন্ত্রহীনতা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন মহলে কিছু উষ্মা দেখা যায় মাঝে মধ্যেই। আবার শেভরন, কনকো ফিলিপের মতো মার্কিন কোম্পানির বিনিয়োগ নিয়েও তীব্র সমালোচনা আছে বাংলাদেশে। তবে এর মধ্যেও একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রেই। বাংলাদেশ বিদেশে যা রফতানি করে তার এক-পঞ্চমাংশই যুক্তরাষ্ট্রে।
আবার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং কৌশলগত সামরিক মিত্র হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পোশাক রফতানি ও অর্থনীতি
হুমায়ুন কবির বলছেন, বাংলাদেশের প্রধান চাওয়া হবে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল হোক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চায় বাংলাদেশ।
‘পাশাপাশি ব্লু ইকোনমির বিস্তৃত দিগন্ত সামনে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সেখানে বড় বিনিয়োগ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের আগ্রহ ও সক্ষমতা আছে। তবে তাদের প্রশাসন আরও কার্যকর ভাবে এগিয়ে আসুক, এটিই বাংলাদেশ চাইছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানির পরিমাণের দিক দিয়ে বাংলাদেশ তৃতীয় শীর্ষ স্থানে রয়েছে এবং এ রফতানি আরো বাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে সরকার ও রফতানিকারকরা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে পোশাকে শুল্ক আরোপ করে অথচ পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের জন্য শুল্ক নেই।
বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলছেন, রানা প্লাজার সময় ১৪টা শর্ত দিয়ে জিএসপি সুবিধা বাতিল করেছিলো যুক্তরাষ্ট্র। পরে এসব শর্ত পূরণ করলেও তারা আর এ সুবিধা ফেরত দেয়নি।
‘অনেক লবিং হয়েছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সাড়া দেয়নি। এটিই আমাদের বড় চাওয়া ছিলো। এটি পেলে আরো অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারতাম আমরা। তবে জিএসপি না দিলেও আমরা চাই আমেরিকা থেকে আনা কটন দিয়ে তৈরি পোশাক আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ দিক তারা,’ বলছিলেন সিদ্দিকুর রহমান।
তিনি বলেন, কারখানার মান, পণ্য মান, কাজের পরিবেশ, শ্রম উন্নয়নসহ সবকিছুতেই বাংলাদেশের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে এবং তারা চান এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তৈরি পোশাকের বিষয়ে আরো উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিক যুক্তরাষ্ট্র।
তৌহিদ হোসেন বলছেন, আপাতত জিএসপি সুবিধা ফেরত পাবার সম্ভাবনা নেই কারণ এগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক নানা মহলের ভূমিকার বিষয় আছে।
তবে এটি ঠিক তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চাওয়াগুলো একটি, বলছিলেন তিনি।
পররাষ্ট্র নীতি ও রোহিঙ্গা ইস্যু
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন মনে করেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের আরো শক্ত অবস্থান নেয়ার সুযোগ আছে এবং এটিই বাংলাদেশ প্রত্যাশা করতেই পারে।
‘চীনকে কেন্দ্র করে আমেরিকার স্বার্থেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়ার সুযোগ আছে দেশটির এবং এটিই বাংলাদেশের এ মুহূর্তে বড় চাওয়া। কারণ মিয়ানমারকে আমেরিকা চাইলেই চীনা বলয় থেকে বের করতে পারবে না।
হুমায়ুন কবির বলছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমেরিকা চাইলে জাপানকে ব্যবহার করেও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরো শক্তভাবে ভূমিকা রাখতে পারে আমেরিকা। আমরা চাই যুক্তরাষ্ট্র সেটাকে কাজে লাগাক,’ বলছেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক আমেনা মোহসিন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে সম্মান করতে হবে।
‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে কংক্রিট অবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে যুক্তরাষ্ট্রের এবং বাংলাদেশ চায় যুক্তরাষ্ট্র সেটুকুই করুক,’ বলছেন তিনি।
তবে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে মডারেট মুসলিম শব্দ ব্যবহার করে ধর্মীয় ট্যাগ না দিয়ে বাংলাদেশকে বরং অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
‘বাংলাদেশ কারো সাথে যুদ্ধে নেই আবার কোনো অ্যালায়েন্স পলিটিক্সেও নেই। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য ও ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহযোগিতার সুযোগ আছে,’ বলছিলেন আমেনা মোহসিন।
অভিবাসন, রেমিট্যান্স
যুক্তরাষ্ট্র হলো ‘কান্ট্রি অব ইমিগ্র্যান্টস’, অর্থাৎ অভিবাসীদের দেশ। ওই দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় আট লাখ। যদিও অনেকে এ সংখ্যা ১০ লাখের বেশি বলে মনে করেন।
আমেনা মহসিন বলছেন, স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে আরো উদারতা ও ইমিগ্রেন্টসদের প্রতি আরো সহানুভূতিই হবে বাংলাদেশের অন্যতম চাওয়া।
তৌহিদ হোসেন বলছেন, বৈধ অভিবাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক এবং সামনে বাংলাদেশীদের জন্য এ সুবিধা থাকবে বলেই মনে করেন তিনি।
‘প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলে ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সহজ। সে কারণেই বহু শিক্ষার্থী এখনো যেতে পারছে। বাংলাদেশ চাইবে এটি যেন অব্যাহত থাকে। বৈধ অভিবাসনের জন্যও বাংলাদেশীদের জন্য ভালো জায়গা যুক্তরাষ্ট্র,’ বলছেন তিনি।
সূত্র : বিবিসি


এ জাতীয় আরো খবর