বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

কোমর ব্যথা প্রতিবন্ধিতার কারণ: ডা: আতিকুর রহমান খান

  • জাতীয় প্রতিবেদক
  • ২০২০-০৯-১৫ ২২:৪৭:০৪
image

কোমর ব্যথা একটি প্রচলিত স্বাস্থ্য সমস্যা। কোমরের নিম্নাংশের ব্যথাকে সাধারণত মাংসপেশি, স্নায়ু, লিগামেন্ট, বাত ও হাড়ের ব্যাধিকে বুঝায়। কোমরের ব্যথায় বৃদ্ধ, মধ্যবয়সী, কিশোর, খেলোয়াড়রা কমবেশি ভুগে।২০১৯ সালে Rheumatology International journal এর systemic review গবেষণায় দেখা গেছে কোমর ব্যথার প্রিভিলেনস রেঞ্জ ১.৪% - ২০%। ২০১২ সালে Lancent journal প্রকাশিত গবেষণায় ২৩% দীর্ঘমেয়াদী কোমর ব্যথার প্রিভিলেনস এরমধ্যে ১১% - ১২% লোক প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী কোমর ব্যথা প্রতিবন্ধিতার কারণ।কোমরের নিম্নাংশে পাঁচটি লাম্বার কশেরুকা, পাঁচটি স্যাক্রাম ও চারটি ককসিস হাড় থাকে। কোমর ব্যথার ৮০% মেকানিক্যাল কারণ যেমন মাংসপেশি, লিগামেন্ট, ডিক্স, পশ্চার এর সমস্যা দেখা দেয়। নন মেকানিক্যাল কারণ যেমন টিউমার, প্রদাহ জনিত, হাড় ভেঙে যাওয়া, কাঠামোগত বিকৃতি-স্কোলিওসিস, কাইফসিস, হাড় ক্ষয় হয়ে যাওয়া।

কোমরের ব্যথার শ্রেণী:

(ক)# প্রাম্ভিক তীব্র ব্যথা - ১ সপ্তাহ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে।

(খ)# উপ প্রাম্ভিক ব্যথা- ৬ সপ্তাহ থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে।

(গ)# দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথা - ১২ সপ্তাহের অধিক থাকে।

কোমর ব্যথার কারণ: মাংসপেশির সমস্যা, লিগামেন্ট, আঘাতজনিত-কশেরুকা হাড় ভেঙে যাওয়া, স্পন্ডিলোলিস্থেসিস, ডিক্স সমস্যা-যেমন ডিক্স হারনিয়েশন, ডিক্স বালজ, বাত, প্যাথলজিক্যাল কারণ-যেমন টিউমার, হাড় ক্ষয় হয়ে যাওয়া, হাড় বেড়ে যাওয়া, দুই হাড়ের মাঝে দীর্ঘদিন প্রদাহ, অঙ্গবিন্যাস (পশ্চার) সঠিক নিয়ম না পালন করা, কোষ্ঠকাঠিন্য, দৈহিক মিলনের সময় সঠিক নিয়ম পালন না করা, গর্ভাবস্থায়, খেলাধুলায় আঘাত, স্থূলতা বা শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া, হঠাৎ মুভমেন্ট হয়ে কোমরে চাপ পড়া।  কোমর ব্যথায় ঝুঁকির কারণ: বয়স, শারীরিক ব্যায়াম না করা, অতিরিক্ত ওজন, বাত, অনুপযুক্ত ওজন উত্তোলন, মানসিক অবস্থা-বিষন্নতা। কোমর ব্যথার চিকিৎসা: কোমর ব্যথার চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমরা বেশী মনোযোগ দেই না। যখন ব্যথা হয় তখন নিজে নিজে ব্যথানাশক ঔষধ সেবন করার ফলে ব্যথা কমে যায়।এভাবে দীর্ঘদিন ব্যথা নিয়ে থাকার কারণে কোমরে এবং শরীরে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা যায়। যার ফলে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না। মানসিক দুশ্চিন্তা ও অন্যান্য সমস্যার কারণে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা তাকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিতে পরিণত করে। তাই কোমরে ব্যথায় প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে। ব্যথা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন নির্দিষ্ট অ্যাসেসমেন্ট এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ  নিতে পারেন। এক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি আধুনিক বিজ্ঞানের খুব কার্যকরী চিকিৎসা ব্যবস্থা। প্রায় সিংহভাগ কোমর ব্যথা ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে ভালো হয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক সার্জারি করতে হয়। ফিজিওথেরাপি পুনর্বাসন চিকিৎসা:

১#ম্যানুয়াল থেরাপি-মোবিলাইজেশন, ম্যানুপুলেশন,। 

২#স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ,

৩#স্টেনদেনিং এক্সারসাইজ,

৪#মায়োফেসিয়াল রিলিজ,

৫#ক্রায়ো প্যাট্রিক,

৬#টিগার পয়েন্ট রিলিজ,

৭#মাসেল এনার্জি টেকনিক,

৮#ড্রাইনিদেলিং

৯#ইলেক্ট্রো থেরাপি-আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, সর্টওয়েভ ডায়াথারমি, মাইক্রোওয়েভ ডায়াথারমি, টেন্স, আইএফটি, আই আর আর, ট্রাকশন, লেজার থেরাপি, মার্সেল স্টিমুলেটর।   

প্রতিরোধ ব্যবস্থা:

১#শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা,

২#নিয়মিত ব্যায়াম করা,

৩#দীর্ঘ সময় বসে না থাকা, একটানা ৪৫ মিনিটের বেশি বসে না থাকা,

৪#হঠাৎ মুভমেন্ট না করা

৫#ভারী জিনিস উঠানোর আগে সর্তকতা নেওয়া,

৬#টিভি দেখা, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল, ব্যবহারে সঠিক পশ্চার ঠিক রাখা,

৭#নিচু হয়ে ঝুঁকে কাজ করার ক্ষেত্রে সর্তকতা অবলম্বন করা,

৮#বিছানা আরামদায়ক ও সমান থাকা,

৯#উঁচু স্থান, যানবাহনে ওঠা-নামার অবসর সময় সাবধানতা অবলম্বন করা,

১০#প্যান্টের পিছনের পকেট এ মোটা মানি ব্যাগ ব্যবহার পরিহার করা,

১১#কাঁদে ভারী ব্যাগ বহন থেকে বিরত থাকা,

১২#একহাতে বেশি ওজন নেওয়া থেকে বিরত থাকুন দুইহাতে সমান ওজন নিন যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করবে,

১৩#শাকসবজি, মাছ ও ফাইবার জাতীয় খাবার গ্রহণ করুন,

১৪#সামুদ্রিক মাছ ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার গ্রহণ করুন,

১৫#প্রতিদিন ২-৩ লিটার পানি পান করুন,

১৬#খেলাধুলার ক্ষেত্রে খেলার পূর্বে ওয়ার্ম আপ করা ও খেলা শেষে কুল ডাউন করা,

১৭#মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকুন,

১৮#কোমরে ব্যথা অনুভব করলে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন,

১৯#নিজে নিজে ব্যথানাশক ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকুন, কারন তা আপনার জীবন সংহার করতে পারে,

২০#কোমর ব্যথা থেকে আরোগ্য লাভ করলে সাবধানতা অবলম্বন করুন,

২১#কোমর ব্যথার জন্য জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।

 

পরিশেষে বলতে চাই বাসায় ফিজিওথেরাপিস্ট এর পরামর্শ মত চলুন। সঠিক পুনর্বাসন চিকিৎসার মাধ্যমে কোমর ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।তাই বলব মুভমেন্ট করুন ব্যথা মুক্ত জীবন গড়ুন। কোমর ব্যথা সম্পর্কে নিজে সচেতন হোন অন্যকে সচেতন করুন।

ডা: আতিকুর রহমান খান। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, লেখক ও গবেষক, ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট, জেপিইউএফ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।


এ জাতীয় আরো খবর