রবিবার, নভেম্বর ২৯, ২০২০

প্রতিবন্ধিতা কোন অভিশাপ নাঃ ডা: আতিকুর রহমান খান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২০-০৯-০৩ ২৩:২৩:১৬
image

অটিজম সারাবিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা। কম হলেও অটিজম শব্দটি আমাদের কাছে পরিচিত। Autism একটি গ্রিক শব্দ aut অর্থ আত্ম বা নিজ এবং ism অর্থ অবস্থা। অটিজম হচ্ছে মস্তিষ্কের স্নায়ুগত একটি বিকাশ জনিত সমস্যা। যার ফলে আক্রান্ত শিশুর যোগাযোগ দক্ষতা, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সামর্থ্য এবং পরিবেশের প্রতি যথাযথভাবে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। WHO তথ্য মতে সারা বিশ্বে প্রতি ১৬০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এএসডি। এরমধ্যে ৫০% বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা ভুকছে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত BMC psychiatry journal গবেষণায় দেখা গেছে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ শ্রীলঙ্কায় ১.০৭%, ইন্ডিয়া ০.০৯%, বাংলাদেশের এএসডি প্রিভিলেনস রেঞ্জ হচ্ছে ০.১৫%-০.৮% কিন্তু ঢাকা সিটিতে অনেক বেশি ৩%. অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) হচ্ছে সমষ্টিগত বিকাশ জনিত সমস্যা। অটিজম কোনো মানসিক রোগ নয় তাই এএসডি কে ৫ শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে।# ১. ক্লাসিক্যাল অটিজম - যোগাযোগ, সামাজিকরণ ও ভাষা বিকাশে সমস্যা দেখা যায়।# ২. এসপারজার সিনড্রোম- যোগাযোগ, সামাজিকীকরণে সমস্যা। কিন্তু ভাষা বিকাশ ঠিক থাকে।# ৩. পারভেসিভ ডেভেলোপমেন্টাল ডিজঅর্ডার নট আদার ওয়াইজ  স্পেসিফাইড- ভাষা ব্যবহার ও বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যা, চোখে চোখ রেখে কথা বলার সমস্যা, পুনরাবৃত্তি আচরণ, কল্পনা শক্তি ব্যবহার করে খেলতে না পারা।# ৪. রেট সিনড্রোম-ভাষা বিকাশ, সামাজিকীকরণে সমস্যা, নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।# ৫. চাইল্ডহুড ডিজঅর্ডার- দুই বছর পর্যন্ত শিশু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। কিন্তু হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেয়, সামাজিকীকরণে সমস্যা হয়, পাকস্থলী ও মূত্রাশয় নিয়ন্ত্রণ থাকেনা।  অটিজমের কিছু কারণ- জেনেটিক, গর্ভধারণের সময় পিতা-মাতার অধিক বয়স, গর্ভকালীন জটিলতা, জন্ম লাভের স্বাভাবিক সময়ের অনেক আগেই শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়া। শিশুর বয়স ০-৩ বছর মধ্যে অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। এএসডি ব্যক্তিদের মধ্যে কারো কারো দেখে মনে রাখতে পারে, গান, ছবি আঁকা এবং গণিতে অত্যন্ত দক্ষতা থাকে। অনেকেই স্বাভাবিক আবার অতি মেধাবী হয় কিন্তু অনেকেই অক্ষম হয় তারা পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকে। অটিজমের লক্ষণ সমূহ। #১. সামাজিক-নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, সমবয়সী শিশুদের সাথে মিশতে ও খেলতে চায় না, সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে অন্যের প্রতি কোন আগ্রহ দেখায় না, খেলা করা, খেলনা ভাগাভাগি করা, নিয়ম কানুন মানা এসব ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়, কোন কারন ছাড়াই হঠাৎ অন্যদের আক্রমণ ও আহত করে।# ২. যোগাযোগ-প্রথমে ভাষার বিকাশ স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন সম্পূর্ণ ভাবে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, কথা পুনরাবৃত্তি করে, অতীতের শোনা শব্দ বা কথা ভুলে যায়, অস্বাভাবিক আওয়াজে এর কথা বলে, আদেশ নির্দেশ মেনে চলতে সমস্যা হয়।# ৩. আচরণগত- একই আচরণ বার বার করে। যেমন হাত নাড়ানো, হাত কামড়ানো, মাথায় আঘাত করা, একইভাবে ঘোড়া, বিভিন্ন জিনিস সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো, অতিমাত্রায় চঞ্চল অথবা নিষ্ক্রিয়, কোন খেলনা দিলে খেলতে পারেনা জানে না কিভাবে খেলতে হয়, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু খাবার খায় এবং একই ধরনের পোশাক বারবার পরতে পছন্দ করে। #৪. পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া - খেলনা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকে বা মুখ দিয়ে লেহন করে, অস্বাভাবিক দেহভঙ্গি করে যেমন শরীর দোলায়, হাত ডানা ঝাপটায়, নড়াচড়া করে, ব্যথা পেলে অনুভব করতে পারে না বা কাঁদে না। সমষ্টিগত চিকিৎসা পদ্ধতি - স্নায়ু বিশেষজ্ঞ, ফিজিওথেরাপি, শ্রবণ মূল্যায়ন, স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, পেডিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ, শিশু মনোবিজ্ঞানী, সেবা কর্মী বা পরিবার। অটিজমের প্রতি গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা, সামাজিক শিক্ষা, পরিবারের সহানুভূতি ও সাহায্য, প্রশিক্ষণের কৌশল, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ, সপ্তাহে ৫ দিন বা পূর্ণ বছর ধরে শিক্ষা মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা, সতস্ফুর্ত প্রয়োগিক যোগাযোগ, জ্ঞান বিকাশ এবং খেলাধুলার দক্ষতা তৈরি করা। পরিশেষে বলতে চাই অটিস্টিক শিশুর বৈশিষ্ট্য এক জনের একেক রকম হয়ে থাকে। যা সবার সাথে মিল নাও থাকতে পারে। এদের মধ্যে কেউ কেউ স্কুলে যেতে সক্ষম হয় কেউ কেউ পুরোপুরি অক্ষম হয় পরনির্ভরশীল হয়। এদের মধ্যে কেউ অত্যন্ত মেধাবী হয়। তাই সার্বক্ষণিক দেখাশোনা বিশেষ শিক্ষা মাধ্যমে অটিজম ব্যক্তিদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা যায়। প্রতিবন্ধিতা কোন অভিশাপ না বা খারাপ বাতাসের ফল না।  ডা: আতিকুর রহমান খান। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, লেখক ও গবেষক, ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট, জেপিইউএফ, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


এ জাতীয় আরো খবর