বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২০

করোনাভাইরাস ও আমাদের পঙ্গপাল!

  • জামিল আহমেদ
  • ২০২০-০৪-১৩ ২২:২৯:৫৪
image

সারা বিশ্ব এখন করোনাভাইরাস যুদ্ধে আছে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার কিছু নেই। কম বেশি সবাই এখন করোনাভাইরাস সম্পর্কে জেনে গেছে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে নতুন করে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে আমাদের। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শীর্ষে এসেও আবার নতুন করে বিশ্ব বিশ্বকে চেনার ও জানার সুযোগ করে দিয়েছে প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস। শক্তিধর রাষ্ট্র এবং বিশ্বের ক্ষমতাসীন ব্যক্তির সম্পর্কে বলে বিরক্ত করতে চাই না। এটাও সবার জানা যে আজ সবাই কত অসহায় ক্ষুদ্র এই ভাইরাসের কাছে! এই যুদ্ধে সবাই প্রস্তুত, তবে কারও কাছে অস্ত্র নেই!

তরুণ মার্কিন গবেষক ড. ক্রেইগ কন্সিডাইন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে   সারা বিশ্বকে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর নির্দেশনা মানার আহবান করেছিলেন। অর্থাৎ লকডাউন। কিন্তু দেশে যখন ২০ জন করোনা রোগী পাওয়া গেছে তখনও আমাদের নিবার্চন কমিশন ভোট উৎসবে মেতে রয়েছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্পষ্ট জানিয়ে ছিলেন ইভিএম এ করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি আছে। তার পরেও আমাদের ইসি……..সাবাশ!

আবার ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি পাওয়ার পর সদরঘাট এবং কমলাপুরে যা দেখা গেছে তা এক নতুন ইতিহাস। এ যেন এক করোনা উৎসব পেয়েছে জাতি! এই লকডাউনের একটি গল্প মনে পড়ে গেল। আমাদের একজন স্যার ছিলেন, তিনি সবসময় খুব ফিটফাট হয়ে থাকতেন। এই ফিটফাট হতে গিয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার পাঁটমিনিট পরে আসতেন কিন্তু মজার বিষয় হল স্যারের এই তাড়াহুড়ু করতে গিয়ে সবসময় প্যান্টের জিপার খোলা থাকতো! আর তা দেখে মেয়েরা শুধু খিলখিল করতো। আমাদের লকডাউনের অবস্থা অনেকটা এই (ভট) স্যারের মতই।

এবার আসা যাক আমাদের রাজনৈতিক অবস্থায়…

মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মন্ত্রী এবং আমাদের মন্ত্রীদের মধ্যে অনেক মিল পাওয়া যায়! মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মন্ত্রীর বেফাঁস কথাবার্তা, কূটচাল, কুমতলব প্রকাশিত হয়। গোপাল ভাঁড় হাতে নাতে ধরিয়ে দেয়। তাও মন্ত্রীর মন্ত্রীত্ব যায় না। আমাদের এমপি-মন্ত্রীদের একই অবস্থা। এছাড়া একটি পক্ষ সবসময় গুজব রাজনীতিতে বিশ্বাসী। কোনো কিছু পেলেই এটা নিয়ে একটা গুজব ছড়িয়ে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। গ্রামের মানুষের মাঝে এখনো করোনাভাইরাস নিয়ে নানা ধরণের গুজব ও বিভ্রান্তমূলক তথ্য বিরাজ করছে। এসব গুজব এবং বিভ্রান্তমূলক তথ্যের কারণে অনেকেই করোনা উপসর্গ নিয়ে ভয়ে ঘরে বসে থাকবে। এতে দেশে আরও মহামারি ছড়ানোর শঙ্কা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্ট উপসর্গ নিয়ে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে এগুলো কিন্তু হিসেবে আসছে না। আবার অনেকে নানা ধরণের গুজবের কারণে এসব উপসর্গ নিয়ে ঘরে বসে আছেন। তাই এখনি প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করা। 

জাতি হিবেসে আমরা কতটুকু সচেতন তা একটি গল্পের মাধ্যমে জানি…

যেমন : গাজীপুর ইতালি ফেরত একজন ব্যক্তিকে বাজারে ঘুরতে দেখে দশ-বার জন মিলে দিলেন পিটুনী! যারা পিটুনী দিয়েছেন তাদের মাথায় তুলে আনন্দ মিছিল করলেন গ্রামবাসী। পরে দেখা গেল যারা পিটুনী দিয়েছেন সবাই জ্বরে আক্রান্ত। আবার দেখা গেল মিটফোর্ড হাসপাতালে একজন করোনা রোগী সনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সাথে সাথে আশেপাশের এলাকার লোক দল বেঁধে আসা শুরু করল সেই রোগীকে দেখতে! করোনা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে দল বেঁধে মিটিং-মিছিল করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় ত্রাণ দিতে গিয়েও ঘটছে অদ্ভুত সব কাণ্ড! যারা ত্রাণ নিতে আসছেন তাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু যারা ত্রাণ দিচ্ছেন তারা পিঁছনে গাঁদাগাধি করে ছবি তুলছেন ফেসবুকে দাতা পরিচয় দেওয়ার জন্য। করোনার জন্য ছুটি পেয়ে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন ভ্রমণে অনেকেই গিয়েছেন! আবার করোনার এই সুযোগে অনেকেই সুন্নত কাজ সারতে চাচ্ছেন। দেশের বিভ্ন্নি গ্রামে পড়েছে গোপনে বিয়ের হিড়িক। তাও আবার আশি থেকে একশ জনের মতো লোক আয়োজন করে। এখানে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে স্থানীয় প্রশাসন কি ঘুমে থাকে? এই হচ্ছে আমাদের সচেতনতার অবস্থা!

আমাদের ব্যবসায়ীক অবস্থা…..
বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরা সবসময় সুযোগ খোঁজেন কখন একটা নতুন ইস্যু আসবে। আর এই সুযোগে তৈরি করবেন সিন্ডিকেট। পেঁয়াজ, রসুন,আদা, চাল, ডাল সবই সিন্ডিকেট হয়ে যায়। এখন ভয়ে আছি দেশে যদি মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তাহলে কখন যে সাদা কাপড়, আগরবাতি , আতর এগুলোরও দাম বেড়ে যায়, সিন্ডিকেট হয়ে যায়! এছাড়া অনেকের প্রয়োজন ১০ কেজি, সে ক্রয় করছে ৩০ কেজি। এটাও পণ্য সংকটের একটা বিরাট কারণ। তাই যারা সিন্ডিকেট করেন এবং বেশি কিনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে চান তারা কিছু সাদা কাপড় আর আতর কিনে রাখতে পারেন! ওহ, ওহ এটাতো বলতে ভুলে গেছি করোনায় মরলে সাদা কাপড়- আতরও ভাগ্যে না থাকতে পারে।

এক দিকে করোনাভাইরাস অন্যদিকে কৃষিতে পঙ্গপালের আক্রমন….

কৃষিতে পঙ্গপালের থাবার কারণে মিনিটে শেষ হয়ে যায় হাজারো মানুষের খাদ্য। এক সাথে কোটি কোটি পঙ্গপাল আক্রমন করে মানুষের খাবারে। আর এই পঙ্গপালের কারণেই খাদ্য সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে সারা বিশ্ব। কিন্তু আমাদের মাঝেও কিছু সংখ্যক পঙ্গপাল রয়েছে তা করোনা না আসলে মানুষ সহজে বুঝতে পারতো না। গরীবের খাবারে যারা থাবা বসায়, ভাগ সবায় তারা কি পঙ্গপাল নয়? চাল চোররা কি পঙ্গপাল নয়? আমাদের পঙ্গপালদের জন্য শাস্তির দুটি অপশন রাখা উচিৎ, একটি হল হাত কাটা অথাবা পিপিই ছাড়া করোনা রোগীর সেবা করতে দেওয়া! যেটা তারা পছন্দ করবে সেই সুযোগ দেওয়া হউক।

করোনার এই মহামারির কারণে খাদ্য সংকটে পড়বে দেশ এবং বিশ্ব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খাদ্য সংকটের কথা ইঙ্গিত করেছেন। কৃষকদের সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন যার যতটুকু জায়গা আছে তাতে ফসল ফলানোর জন্য। কৃষকদের জন্য প্রনোদনাও তৈরি করেছেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশেও কিছু পঙ্গপাল রয়েছেন। সেই পঙ্গপালের কারণে কি কৃষকরা এই সুযোগ পাবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঠিক সিন্ধান্তের সাথে যদি উনার পঙ্গপাল ধরে রাখতে পারেন তাহলে হয়েতো এই বিপদ থেকে মহান আল্লাহ আমাদের রক্ষা করতে পারেন। আল্লাহর নির্দেশে নবী ইউসুফ(আঃ) মিশরের মানুষকে  ঐ সময় যেভাবে খাদ্য সংকট থেকে রক্ষা করেছিলেন আমাদের কৃষিমন্ত্রী সেই পথ অনুসরণ করলে হয়তো আমরা এই বিপদ থেকে আল্লাহ চাইলে রক্ষা পেতে পারি। কৃষিমন্ত্রী একটি দেশের খাদ্য সংকট মোকাবেলার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিচক্ষণতা এবং সঠিক সিন্ধান্ত নিলে এই সংকট থেকে আল্লাহ চাইলে অতিক্রম করা সম্ভব। এই মুহূর্তে কৃষকদের ১০০% প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। গার্মেন্টস মালিকরা ২% সুদে ঋণ পেলেন আমাদের কৃষকরা পেলেন ৫%সুদে। আমাদের কৃষকদের ৫% সুদে ঋণ প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন তাদের হাতে বীজ, সার,ওষধ দিয়ে বলা একটি জমিও যেন খালি না থাকে। কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, খাদ্য সংকট হবে নিরুদ্দেশ। অন্যথায় খাদ্য সংকট মহামারির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ দেখিনি হয়তো দেখবো ২০২০-২০২১ সালের দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষ হবে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। সব দেশই আগে নিজেদের খাদ্য সংরক্ষণ করবে পরে রপ্তানির কথা চিন্তা করবে। তাই নিজেরাই নিজেদের খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। না হলে আবার বলতে হবে ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো'
পরিশেষে বলতে চাই করোনার আর্শিবাদে  প্রাণ ফিরে পাক পৃথিবী, 
যে যেখানে থাকো, ভালো থেকো। বেঁচে থাকলে দেখা হবে এই ক্লান্তি লগ্নের পরে অথবা হাশরে!
লেখক : জামিল আহমেদ মোহন (সংবাদকর্মী)
ই-মেইল :zamild2k@yahoo.com


এ জাতীয় আরো খবর