শনিবার, মে ৩০, ২০২০

চৈত্রসংক্রান্তি ও চৌদ্দশাক

  • রিতু পারভী
  • ২০২০-০৪-১৩ ২২:১৯:৪৫
image

চৈত্রসংক্রান্তি প্রাণ রক্ষার শপথের দিন। এই দিন বাংলার মেয়েরা প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার জন্য নানান ব্রত ও নিজের “নিয়ত” বা “মানত” পালন করে।

চৈত্রসংক্রান্তির রীতি আছে গ্রামের নারীদের চৌদ্দ রকম শাক কুড়াতে হবে।

আবাদী নয় কিন্তু অনাবাদী, অর্থাৎ বাড়ীর আশে পাশে, খাল পুকুর ডোবার ধারে, রাস্তার ধারে, ক্ষেতের আইলে, চকে আপনজালা শাক তুলতে হবে। অর্থাৎ নিজে থেকে হয়ে ওঠা শাক। ঘরের পাশে আলান পালান মাঠের আনাচে কানাচে থেকে।

নারীকে খবর নিতে হবে প্রকৃতির যে অংশ অনাবাদী - যে অংশ কৃষি সংস্কৃতির সংরক্ষণ করে রাখার কথা, নইলে প্রাণের সংরক্ষণ ও বিকাশ অসম্ভব - সেই অনাবাদী প্রকৃতি ঠিক আছে কিনা। যেসব গাছপালা, প্রাণ ও প্রাণী আবাদ করতে গিয়ে আবাদী জায়গায় কৃষক তাদের দমন করেছে, উঠতে দেয় নি, থাকতে দেয় নি, তারা সব কি ঠিকঠাক আছে?

চৈত্র সংক্রান্তিতে চৌদ্দ রকম শাক খাওয়া তো আসলে সব রকম গাছপালা প্রাণ ও প্রাণীর হালহকিকতের খোঁজ নেওয়া। 'চৌদ্দ' সংখ্যাটা এই দিক থেকে প্রতীকী। নারীকে খবর নিতে হবে পুরুষ সারাবছর যে 'চাষ' করল তাতে অনাবাদি জাতি বা প্রজাতির হাল হকিকতের কি অবস্থা।

চাষ করার অর্থ আবাদী ফসলের দিকে মনোযোগ দেওয়া, কিন্তু অনাবাদি ফসলের বিশাল ক্ষেত্র যেন তাতে নষ্ট বা কৃষ্য ব্যবস্থায় গৌণ না হয়ে পড়ে তার জন্যই চৌদ্দ রকম শাক তোলা ও খাওয়ার রীতি চালু হয়েছে। চৌদ্দ রকম শাক পাওয়ার অর্থ হচ্ছে কৃষিকাজ পরিবেশসম্মত হয়েছে , কারণ কোন অনাবাদি শাক গৃহস্থের আলালন পালান থেকে হারিয়ে যায় নি।

চৌদ্দ রকমের শাক একত্রে মিশিয়ে রান্না করে খেলে শরীরে রোগ-ব্যাধি হয় না বলে গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন। তাছাড়া এসব কুড়িয়ে পাওয়া শাকে অনেক ওষুধি গুনাগুণও রয়েছে। গর্ভবতী মায়েরা বাচ্চার পুষ্টির জন্য এসব কুড়ানো শাক খান।

গিমা শাক খেলে পেট ফাঁপা, পেটের গ্যাস ভাল হয়। তেলাকুচা পাতার শাক খেলে চোখের জ্যোতি বাড়ে। ঢেঁকিশাক, কলমি শাক খেলে মাথা ব্যাথা করে না। কস্তুরী শাক খেলে আমাশা রোগ ভাল হয়।

একটি গবেষণায় (বইয়ের নামঃ আমাদের কুড়ীয়ে পাওয়া শাক) দেখা গেছে, এই সব শাক কুড়াতে মেয়েরা ১ থেকে ২ কিমি পথ দূর থেকেও নিয়ে আসেন । তারা খুব খুশি হন যদি এই দুরত্বের মধ্যে অন্তত চৌদ্দ রকমের কূড়িয়ে নিয়ে আসতে পারেন।

এই রকমের খাদ্যের প্রাপ্তি ও প্রাচুর্যতার মধ্য দিয়েও নারীরা বুঝে নেন তাঁদের গ্রামটি খাদ্য স্বার্বভৌমত্ব ও খাদ্যের সমৃদ্বির দিক থেকে নিরাপদ। এসব শাক যেন হারিয়ে না যায় তার প্রতিও তারা খেয়াল রাখেন।

ঋতু পরিবর্তনজনিত রোগব্যাধির হাত থেকে বাঁচার জন্যই মূলত চৌদ্দশাক খাওয়া হয়।

ঋষিরা ধর্মের মোড়কে বেঁধে দিয়ে গেছেন চৌদ্দশাক খাবার প্রয়োজনীয়তাকে।

"ওলং কেমুকবাস্তুকং সার্ষপঞ্চ নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চিং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলূকং গুড়ুচীন্তথা। ভন্টাকীং সুনিষণ্ণকং শিবদিনে যদন্তি যে মানবাঃ প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।"
-কৃত্যকৃত্ত্ব /রঘুনন্দন।

শাস্ত্রে উল্লেখিত চৌদ্দশাক-

১. ওল - Amorphophallus campalunatus (araceae)
২. কেঁউ - Cheilocostus speciosus (costaceae)
৩. বথুয়া Chenopodium album (chenopodiaceae)
৪. কালকাসুন্দে Senna Occidentalis (caesalpaneaceae)
৫. সরষে Brassica campestris (cruciferae)
৬. নিম Azadirachta indica ( meliaceae)
৭. জয়ন্তী Sesbania sesbans (fabaceae)
৮. শালিঞ্চে বা শিঞ্চে Alternanthera sessilis (amaranthaceae)
৯. গুলঞ্চ Tinospora cordifolia (menispermaceae )
১০. পটল বা পলতা Trichosanthes dioica (cucurbitaceae)
১১. শেলুকা Cordia dichotoma (boraginaceae)
১২. হিলমোচিকা বা হেলেঞ্চা Enhydra fluctuans ( asteraceae)
১৩. ভাঁট বা ঘেঁটু Clerodendrum splendens ( verbanaceae )
১৪. সুনিষণ্নক বা শুষনি Marsellia quadrifolia ( marsiliaceae )

বঙ্গের অনাবাদী অন্যান্য শাক-

১৫. আমরুল Oxalis corniculata
১৬. কলমি Ipomoea aquatica
১৭. কুলেখাড়া Hygrophila auriculata
১৮. খারকোন বা ঘাটকোল Typhonium trilobatum
১৯. ব্রাহ্মী Bacopa monnieri
২০. ঢেঁকিশাক Diplazium esculentum
২১. নুনিয়া বা নুন খুড়িয়া Portulaca oleracea
২২. তেলাকুচা Coccinia grandis
২৩. দন্ডকলস Leucas aspera
২৪. গিমা Glinus oppositifolius
২৫. থানকুনি Centella asiatica Urban
২৬. কাঁটানটে বা খৈরাকাটা Amaranthus spinosus
২৭. কচু Colocasia esculenta
২৮. ঘাগরা বা হাগড়া (বিষাক্ত) Xanthium strumarium
২৯. মালঞ্চ Alternanthera philoxeroides
৩০. কালমেঘ বা আলুই Andrographis paniculata
৩১. বাসক Justicia adhatoda
৩২. চুকোর বা টক ভেন্ডি Hibiscus sabdariffa
৩৩. কস্তরী Abelmoschus moschatus
৩৪. মোরগফুল Celosia argentea var. cristata)

উপরে উল্লিখিত শাকের যে কোন চৌদ্দটি শাক কুড়িয়ে চৌদ্দশাক প্রথা পালন করা যায়।

চৌদ্দশাক রান্নার কোনও নির্দিষ্ট প্রস্তুত প্রণালী নেই। একেক জায়গায় একেক রকম ভাবে এই শাক রান্না করা হয়। আমিষ অথবা নিরামিষ যেকোনো ভাবেই এই শাক খাওয়ার রেওয়াজ আছে। এক্ষেত্রে কোথাও কালজিরে-কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, কোথাও রসুন-শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, আবার কোথাও শুধু পাঁচফোড়ন দিয়েও চৌদ্দশাক ভাজা খাওয়া হয়। কোথাও কোথাও চৌদ্দশাক শুধুই ভাজা খাওয়া হয়, অনেকক্ষেত্রে আলু বা বেগুন দিয়েও ভেজে খাওয়ার প্রচলন আছে।

তথ্যসূত্র:
১. চিরঞ্জীব বনৌষধি - আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য, ২. ভারতীয় বনৌষধি - ড.কালিদাস বিশ্বাস, ৩. বাংলাদেশ আগাছা পরিচিতি- বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ৪. পুষ্টি বাগান ও বাংলার শাক-সংস্কৃতি - ড. কল্যাণ চক্রবর্তী,
৫. উইকিপিডিয়া, ৬. আমাদের কুড়ীয়ে পাওয়া শাক - উবিনীগ, ৭. বাঙলার শাক - ডিআরসিএসসি, ৮. প্রাযোগ, ৯. নুনেতে ভাতেতে।


এ জাতীয় আরো খবর