রবিবার, জুন ৭, ২০২০

ঘোড়ার খুরের দাপটে সেই বিস্তৃত প্রান্তরে

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-১৫ ১০:৩২:৩৭
image

শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্নেহধন্য কবি জহির দেহলভির সিপাহি বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘দাস্তান-ই-গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনি’। সিপাহি বিদ্রোহের এ অমূল্য দলিল নিয়ে শানজিদ অর্ণবের রূপান্তরে ধারাবাহিক আয়োজন—

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জবাব

আক্রমণের জবাব কী হবে?

ব্রিটিশ সেনাদল গাজিয়াবাদের কাছে হিন্দোন নদীর এ পাশে উপস্থিত হলো। সর্বত্র বিউগলের সুর শোনা গেল।

সেনাদল দ্রুত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। তোপখানা প্রস্তুত। কাঠের গাড়িগুলো গোলাভরা কামান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্লাটুনগুলো সতর্ক অবস্থায় আছে আর অন্য পাশে রেজিমেন্টগুলো দাঁড়িয়ে—এমন সময় আক্রমণের নির্দেশ দেয়া হলো। সেনাবাহিনী সঙ্গে সঙ্গে সালিমগড়ের নিচে সেতুর দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। সেতু দিয়ে যমুনা নদী পার হয়ে তারা রাস্তা ধরে শাহদারার দিকে এগিয়ে যায়। তখন সময় সকাল ১০টা।

প্রথম লড়াই

দুপুর নাগাদ আমরা প্রথম কামানের গর্জন শুনতে পেলাম। শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম, এটা সময়ের ঘোষণা দেয়া কামানের গোলা। কিন্তু তার পরই আবার কামান গর্জে উঠল। আমরা তখন বুঝতে পারলাম, এটা হলো লড়াই শুরু হওয়ার ঘোষণা। এবার কামান ও বন্দুক থেকে সমানে গোলাগুলি শুরু হলো। দুই ঘণ্টা ধরে এই গোলাগুলি অব্যাহত থাকল। এরপর শুরু হলো থেমে থেমে গোলাগুলি। এই যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থান ছিল কেল্লা থেকে অন্তত বারো-তেরো মাইল দূরে।

তখন ছিল বেলা ৩টা। মনে হলো ব্রিটিশ সেনারা কেবল যে দ্বিগুণ গতিতে শহরে পৌঁছেছে তা-ই নয়, পৌঁছার দুই ঘণ্টার মধ্যে তারা বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়েছে।

তিন ঘণ্টার মধ্যে লড়াইয়ের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনো নগরের মধ্যে আমরা অপেক্ষা করছিলাম কারা জয়ী হলো আর কারা হারল সেটা জানতে।

বিকাল ৫টা নাগাদ আমি কেল্লা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। দেখলাম ভারতীয় সেনারা লাহোরি ফটকের ছাত্তায় ফিরছে। কামান বহনকারী তাদের কাঠের গাড়িগুলো দলের সামনে সামনে চলছে। গাড়িতে থাকা একটি কামানের গোলার কাঠের বাক্সে হেলান দিয়ে বসে ছিল এক তরুণ, কিন্তু সে অচেতন। আমার মনে হয়েছিল ছেলেটা আঘাত পেয়েছে, তাই সামনের সওয়ারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছেলেটা কোথায় আঘাত পেয়েছে?’

অশ্বারোহী জানাল, ‘সে আঘাত পায়নি। তার গায়ে একটা ঠাণ্ডা গোলার (ব্যবহূত কামানের গোলা) আঘাত লেগেছে এবং তাতেই সে অজ্ঞান হয়ে গেছে।’

আমি দেখলাম অশ্বারোহী ও পদাতিক সেনারা ট্রাম্পেট বাজিয়ে হাসিমুখে দলবেঁধে এগিয়ে যাচ্ছে।

আমি এক সওয়ারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন কেন?’

সওয়ার জবাব দিল, ‘আমরা জিতেছি। গোরারা পালিয়ে গেছে। তাই ফিরে এসেছি।’

আমি তাকে আবার প্রশ্ন করলাম, ‘কেমন লড়াই করলেন?’

সে বলল, ‘আমরা ছিলাম বাঁধের এ পাড়ে আর তারা ছিল অন্য পাড়ে। উভয় পক্ষই গোলা ছুড়ছিল এবং আমরাই আধিপত্য বিস্তার করি। আমরা একের পর এক গোলা ছুড়তে থাকি আর গোরারা দিনের গরম সহ্য করতে পারেনি। আমরা দূর থেকেই দেখছিলাম তারা হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের অশ্বারোহী বাহিনী যখন তাদের আক্রমণ করল, তখন তারা আতঙ্কে পালিয়ে গেল। তারা তাদের গোলন্দাজ বন্দুকগুলো সঙ্গে নিয়ে গেছে।’

দ্বিতীয় লড়াই

দ্বিতীয় লড়াইটা খুব তীব্র হয়েছিল। গাজিয়াবাদের প্রথম লড়াইয়ের পর আর কোনো লড়াই কিংবা যুদ্ধের উদাহরণ নেই। পুরবিয়ারা নানা বিনোদনে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষকে আর বিরক্ত করেনি। তারা প্রচুর পরিমাণে ভাঙ পান করত আর লাড্ডু পেদা খেত। তারা নিজেদের রান্নাবান্না বন্ধ করে দিয়েছিল এবং তাই দুই বেলাতেই পুরি কাচোরি ও মিষ্টি খেত এবং রাতে শান্তিতে ঘুমাত।

সবদিক থেকেই সাহায্য আসছিল: লক্ষেৗয়ের রেজিমেন্ট এল, জালান্দারের প্লাটুনও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিল। এতে বিদ্রোহীদের পদাতিক বাহিনীতে সেনার সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় বারো-পনেরো হাজার। মীরাট কারাগার থেকে যে অপরাধীদের বিদ্রোহীরা মুক্ত করে দিয়েছিল, তারা দিল্লিতে সঙ্গেই এসেছিল এবং তখনো বিদ্রোহীদের সঙ্গে ছিল। দিল্লির কারাগারে থাকা ছোটখাটো চোর, পকেটমারদের মুক্ত করা হয়েছিল এবং এখন এরাও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অংশ।

বিদ্রোহীরা মীরাট থেকে দিল্লিতে এসেছিল রমজান মাসের ১৬ তারিখে, তারপর প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হয়েছে। বিকাল ৫টা নাগাদ আমি কেল্লা থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। এমন সময় নীল পোশাক পরা দুজন

অশ্বারোহী সেনার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তাদের হাতে ছিল নীল পতাকা। তাদের পোশাক ও চালচলন দেখে মনে হলো তারা কোনো রেজিমেন্টের কর্মকর্তা। তারা ছিল মুসলিম এবং আমরা সালাম ও কুশলাদি বিনিময় করলাম। এর আগে আমি এ রকম পোশাক দেখিনি, তাই আমার সন্দেহ হলো তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নতুন কোনো পদমর্যাদার সেনা কিনা।

‘আপনারা কোন রেজিমেন্টের?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘চতুর্থ রেজিমেন্ট,’ তারা জবাব দিল।

আমি বিস্মিত হলাম। ‘এখানে তো চতুর্থ রেজিমেন্ট বলে কিছু নেই!’

‘চতুর্থ রেজিমেন্ট এসেছে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে,’ তারা উত্তর দিল।

‘ব্রিটিশ বাহিনী কোথায়?’

‘আলীপুরে।’

‘আপনারা কেন আলীপুর থেকে এলেন?’ বিস্মিত কণ্ঠে আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমরা গোপনে আমাদের ভারতীয় ভাইদের এটা বলতে এসেছি, যুদ্ধের মাঝখানে আমরা ব্রিটিশদের ত্যাগ করে তাদের সঙ্গে যোগ দেব। তখন ভুল করে তারা যেন আমাদের ওপর গুলি না চালায়। এজন্য তাদের সতর্ক থাকতে হবে।’

সেই অশ্বারোহীরা আমার কাছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা কোথায় অবস্থান করছেন তা জানতে চাইলেন। আমি তাদের পথ দেখিয়ে বললাম: ‘ছাট্টা থেকে ত্রিপোলিয়া ও খাল ধরে বাঁ দিকে যান। যখন কেল্লার দরজার কাছে পৌঁছবেন, তখন নদীর ওপর পুরনো সেতু ও সালিমগড় দরওয়াজা দেখতে পাবেন। এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই আপনারা সব কর্মকর্তাকে পেয়ে যাবেন।’

সওয়াররা সালিমগড়ের উদ্দেশে চলে গেলেন আর আমি আমার বাড়িতে ফিরলাম। কিছু সময় পর সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ বিউগলের শব্দ শোনা গেল। এই শব্দ শোনামাত্র ভারতীয় সেনারা প্রস্তুত হয়ে তাদের বন্দুক ও গোলাবারুদ বের করতে শুরু করল। এক বন্ধুর বাড়ির ছাদ থেকে আমি তাদের প্রস্তুতি দেখছিলাম। তারা তাদের আস্তানা ছেড়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় বলদ গোলাবারুদের কাঠের বাক্সগুলো পেছন পেছন গাড়িতে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

এটা ছিল এক চাঁদনী রাত। একটু পর সেনারা কেল্লা থেকে বেরিয়ে এল। তারা বড় বন্দুক ও গোলাবারুদ একটা পাহাড়ের ওপর তুলছিল, এখানে ছিল প্রায় দুই হাজার সেনা। বাকিরা আলীপুরে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। আমি শুনলাম সেনাদের মধ্যে দূরত্ব এক মাইল বা তার কাছাকাছি। এই প্রতিরক্ষা নিয়েই রাত কেটে গেল। পুরবিয়ারা তাদের বাঁ দিকে তিনটি বড় বন্দুক রেখেছিল এবং বাকিগুলো ঘোড়ার পিঠে তুলে বাহিনীর কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। বড় বন্দুকগুলো এবার গর্জে উঠল। আমি শুনেছিলাম এই বন্দুকগুলো ব্রিটিশদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল। ফজরের নামাজের আগে আগে ব্রিটিশরা এই বড় বন্দুকগুলোর ওপর আক্রমণ করল। এই সেনারা নীল পোশাক পরে নীল পতাকা নাড়ছিল। ফলে ভারতীয় সেনারা ভেবেছিল, তারা নিশ্চয়ই চতুর্থ রেজিমেন্টের সেনা, যাদের কথা সেই দুই অশ্বারোহী বলে গিয়েছিলেন। কথামতো ভারতীয় সেনারা তাদের দিকে গুলি ছুড়ল না।

কিন্তু হায়! ভারতীয় সেনারা ব্রিটিশদের ধোঁকায় পড়ল।

এবার ভয়ানক লড়াই শুরু হলো। সওয়াররা যখন বুঝল, এরা ব্রিটিশ সেনা, তখন তারা নিজেদের বন্দুক লোড করল। কিন্তু ততক্ষণে ব্রিটিশ সেনারা কাছে চলে এসেছিল।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিল, গোলাগুলি শুরু হওয়ার পর দৃশ্যটা হয়েছিল তুলোধুনোর মতো, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন তুলো যেন বাতাসে উড়ছিল। এই তুলোর মতোই ঘোড়া ও সেনাদের দেহের টুকরো বাতাসে উড়ছিল।

তা সত্ত্বেও কমান্ডার এমন উদ্দীপক ও সাহসী স্বরে তার সেনাদের আহ্বান জানালেন, পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে যেন তার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল। সেই আহ্বানে সেনারা সাড়া দিয়ে মৃতদেহের ওপর দিয়ে ঘোড়াকে লাফিয়ে লাফিয়ে বড় বন্দুকগুলোর কাছে পৌঁছলেন।

বাকি লড়াই হলো বর্শা আর বেয়নেট দিয়ে। শেষমেশ ব্রিটিশ সেনারা বিদ্রোহীদের বন্দুকগুলো দখল করে নিল এবং সেগুলো দিয়ে ভারতীয় সেনাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করল। পদাতিক সেনারা একে অন্যের সঙ্গে সম্মুখ লড়াই শুরু করল। তখনো দুই পক্ষ একে অন্যের দিকে গুলি ছুড়ে যাচ্ছিল, গোলাগুলির শব্দে কানে তালা লাগার দশা।

ঘোড়ার খুরের দাপটে সেই বিস্তৃত প্রান্তরে

স্বর্গ আর দুনিয়া যেন আরেক জগৎ হাজির হয়েছে


এ জাতীয় আরো খবর