শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২০

জলদস্যুদের থেকে রাজধানী রক্ষাকারী দুর্গ

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-১২ ১১:১৭:২০
image

ভোরে ঘুম ভেঙেই মনে হলো, আজ তো শুক্রবার! এ দিনটির জন্য কতই না অপেক্ষা! অনেক দিনের পরিকল্পনা পূরণ  হতে  যাচ্ছে  আর কয়েক ঘণ্টা পরই। প্রকৃতি বাংলাদেশের সুজন সেন গুপ্তের দলের সঙ্গে চললাম হাজীগঞ্জ দুর্গ। হাজীগঞ্জ দুর্গ নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে অবস্থিত। ঢাকা থেকে হাজীগঞ্জ দুর্গ প্রায় ১ ঘণ্টার রাস্তা। এটা খিজিরপুর দুর্গ নামেও পরিচিত।

 

ঢাকায় মোগল রাজধানী স্থাপনের অব্যবহিত পর নদীপথে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে দুর্গটি নির্মিত। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ কেল্লার সামনে দাঁড়াতেই বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। অদ্ভুত সুন্দর বিশাল এক কেল্লা। একটু শিহরণও জাগল ভেতরে এই ভেবে যে, এ বিশাল কেল্লা তৈরি করা হয়েছিল যুদ্ধের জন্য। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে মোগল শাসক ঈশা খাঁ মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কবল থেকে এ জনপদ রক্ষার জন্য শীতলক্ষ্যা-ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলে কেল্লাটি নির্মাণ করেন। এখানে দিনের পর দিন না জানি কত যুদ্ধ হয়েছে।


কথা বলছিলাম হাজীগঞ্জ দুর্গ এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি নাসির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বললেন, সতেরো শতকের বা তারও আগে নির্মিত এ দুর্গের সঠিক স্থপতির নাম পরিষ্কারভাবে কোথাও নেই। তবে ধারণা করা হয়, সম্ভবত সুবেদার ইসলাম খানের সঙ্গে সংঘর্ষকালে ঈশা খাঁ এ দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর রাজধানী সোনারগাঁর নিরাপত্তার জন্য মীর জুমলা অধিকাংশ সময় অবস্থান করতেন এ কেল্লায়। প্রায় দুই কিলোমিটার জায়গা নিয়ে বিস্তৃত এ দুর্গ। দুর্গের মাঝে পুরোটাই ফাঁকা মাঠ। ধারণা করা হয়, এখানে অবস্থান নেয়া সৈন্যরা এ মাঠে তাঁবু খাটিয়ে থাকতেন। সে সময়ে যেহেতু নদীপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম, তাই নদীপথের আক্রমণ রুখতে নদী-তীরবর্তী জায়গাতেই নির্মাণ করা হয় দুর্গটি। বর্তমানে এটি শিশুদের খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে।

 

এদিকে প্রকৃতি বাংলাদেশ দলের স্বরূপ সেন গুপ্ত তার দলবল নিয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করে দিলেন। আর এদিকে আমরা দুর্গের আশপাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। এটি একটি ইট-সুরকির তৈরি ছোট চতুর্ভুজাকৃতির দুর্গ। দুর্গটি বেশ চওড়া প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। দুর্গের প্রাচীরে রয়েছে বন্দুক বসিয়ে গুলি চালানোর ফোকর। দুর্গের উত্তর দেয়ালেই এর একমাত্র প্রবেশপথ ‘দুর্গ তোরণ’। কিছুটা উঁচু এ দুর্গে ঢুকতে হলে আপনাকে প্রবেশ তোরণের প্রায় ২০টি সিঁড়ি ডিঙাতে হবে। আর তোরণ থেকে দুর্গ চত্বরে নামতে হবে আটটি ধাপ। প্রাচীরের ভেতরে চারদিকে চলাচলের পথ রয়েছে প্রাচীরঘেঁষেই। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় দুটি বুরুজ আছে। আরো একটি বুরুজ রয়েছে দক্ষিণ পাশে। তাছাড়া উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম কোনায় ছোট দুটি বুরুজ অংশ আছে, যেখানে একসঙ্গে কয়েকজন বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাতে পারত। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারে ঢোকার জন্য ছিল ছোট্ট একটি পূর্বমুখী দরজা। ভেতরে ঠিক মাঝখানে একটি মোটা গোল পিলার, পিলারের সঙ্গে ছিল গোলাকার সিঁড়ি। আজ পিলারটি টিকে থাকলেও নিচের দিকের অনেকটুকু সিঁড়িই ভেঙে গেছে। শুধু কি তাই, গোটা ওয়াচ টাওয়ারটি আজ বিলীন হওয়ার পথে!

 

দুর্গ চত্বরের পশ্চিম দিকে আছে বেশ বড় একটি আমগাছ আর পূর্ব পাশে আছে বড় একটি লিচুগাছ। লিচুগাছটি বিচিত্রভাবে বেঁচে আছে তার অর্ধেক ক্ষয়ে যাওয়া দেহ নিয়ে। নাসির উদ্দিন আমাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, সময়ের ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন মানুষ এ দুর্গ ব্যবহার করেছে। আবার কখনো এখান থেকে পরিচালনা করেছে যুদ্ধ। একসময় ঢাকার নবাবরা এটিকে ঘিরে হাফেজ মঞ্জিল নামে একটি প্রাসাদ ও উদ্যান নির্মাণ করেছিলেন—এমন জনশ্রুতিও আছে। সময়ের ব্যবধানে একসময়ের রক্ত হিম করা নাম হাজীগঞ্জ দুর্গ এক নীরব নিস্তব্ধ পুরাকীর্তি। কেল্লার পথে খাসজমির ওপর পাটগুদামগুলো স্বাধীনতার পর থেকে অস্থায়ী লিজের কারণে এর সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হতে থাকে। যদিও মাঝে মধ্যে চলে প্রশাসনের লোক দেখানো সংস্কার, যা উল্লেখ করার মতো কিছুই নয়। এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিন পর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্প বলে প্রতীয়মান হবে। এরপর আমরা গেলাম বিবি মরিয়মের সমাধি ও মসজিদে। এটি হাজীগঞ্জ দুর্গ থেকে কিছু দূর এগোলেই পাওয়া যাবে। হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত বলে এ মসজিদ হাজীগঞ্জ মসজিদ নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৪ থেকে ১৬৮৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এ মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের কাছে তার কন্যা বিবি মরিয়মের সমাধি রয়েছে বলে এর নাম বিবি মরিয়ম মসজিদ এবং এ নামেই এটা বেশি পরিচিত।

হাজীগঞ্জ দুর্গটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত। এখনো দুর্গটি চমত্কার স্থাপত্য নিয়ে মোগল যুগের গৌরবের কথা বলছে।

পথের ঠিকানা: ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী বা কমলাপুর। গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা নন-এসি বাসে। ভাড়া পড়বে ২৫ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে। আর কমলাপুর থেকে যাবেন ট্রেনে, ভাড়া ১০ টাকার বেশি না। কমবেশি ৪৫ মিনিটে পৌঁছে যাবেন ঢাকা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ বাস বা ট্রেন স্টেশন থেকে ১৫-২০ টাকা রিকশা ভাড়া নেবে হাজীগঞ্জ কেল্লায় যেতে।

 

ছবি: লেখক

সুমন্ত গুপ্ত, এনসিসি ব্যাংকের কর্মকর্তা


এ জাতীয় আরো খবর