শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০

গৃহহীন নয়, স্বাবলম্বীরা ঘর পেয়েছেন

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-১১ ১৭:০৮:৪১
image

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মিনারা বেগম। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তার পরিবারের। সরকারি উদ্যোগে গৃহহীন পরিবারের জন্য ঘর তৈরি করে দেয়ার খবর পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেন চল্লিশোর্ধ্ব এ নারী। এখন পর্যন্ত কোনো ঘর জোটেনি মিনারা বেগমের। যদিও গৃহ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহীন পরিবার অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা।

 

তবে একই ইউনিয়নের বাসিন্দা মিলন খাঁর গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিকভাবে সচ্ছল মিলন পরিবার নিয়ে থাকেন পাথরঘাটা সদরে। গৃহহীনদের জন্য বরাদ্দকৃত একটি ঘর পেয়েছেন তিনিও। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘর পাওয়ার জন্যই গ্রামে জমি কেনেন মিলন।

 

রাজনৈতিক বিবেচনা, জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতি ও টাকার বিনিময়ে ঘর বরাদ্দের কারণে মিনারা বেগমের মতো অনেক গৃহহীনই সরকারের বড় এ উদ্যোগের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ঘর বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে আর্থিকভাবে সচ্ছল অনেক পরিবারকে।

 

জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গৃহহীন পরিবারের জন্য ১১ হাজার ৬০৪টি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ বরাদ্দ দেয় সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির মাধ্যমে এসব ঘর নির্মাণে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। এসব ঘর নির্মাণ কার্যক্রম সমাপ্ত হয় গত বছরের জুনে। চলতি বছরের শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত ইন্টার্নশিপের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের একদল শিক্ষার্থী আট ভাগ হয়ে কয়েকটি উপেজলায় নির্মিত দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ পরিদর্শনে যান। সেখান থেকে ফিরে পরিদর্শনে পাওয়া পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রতিবেদনে গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ বরাদ্দ এবং নির্মাণে বেশকিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।

 

শিক্ষার্থীদের একটি দল যায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায়। তাদের প্রতিবেদনে দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ বিষয়ে কিছু প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সঠিকভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয় না। এর উদাহরণ হিসেবে তারা সেখানে উল্লেখ করেন, দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহের একজন সুবিধাভোগী বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের তাফালবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. খলিলুর রহমান। পেশায় মত্স্যজীবী হলেও কাঠের ব্যবসা করেন তিনি। হাঁস-মুরগি পালনের পাশাপাশি নিজের পুকুরে মাছও চাষ করেন তিনি। তার মালিকানাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ৩৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল জীবনযাপন করেন তিনি। এমনকি সরকারের দেয়া সম্পদ নিজ অর্থায়নে তিনি সম্প্রসারণও করেছেন। অন্যদিকে উপজেলার অনেক গৃহহীন পরিবারই দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ বরাদ্দ পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এছাড়া বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা পরিবর্তন ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে শিক্ষার্থীদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ দলের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মাসুমা মরিয়ম বলেন, দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ প্রকল্পটি সরকারের সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ।দুর্যোগের দিক থেকে পাথরঘাটা সব থেকে নাজুক একটি উপজেলা, তাই এ এলাকায় এ ধরনের বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পকে এলাকাবাসী সাধুবাদ জানিয়েছে। যদি সঠিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা যায় তাহলে এ প্রকল্প আরো বেশি সফল হবে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি দেশের সব এলাকায় সমান বরাদ্দ না দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বেশি বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। 

 

শিক্ষার্থীদের আরেকটি দল যায় পিরোজপুরের নেছারাবাদে। তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নেছারাবাদ উপজেলায় ২৯টি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ করা হয়। এসব গৃহের সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে। সরকার থেকে পাওয়া ঘরে বাস করেন না এমন ব্যক্তিকেও ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ঘর নির্মাণের নকশা অনুসরণ করা হয়নি। পূর্ণাঙ্গ কাজ সমাপ্ত না করেই ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। নির্মাণের কয়েকদিনের মধ্যে কিছু ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিক্ষার্থীদের দেয়া প্রতিবেদনের আলোকে অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোহসীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমার গ্রাম আমার শহর ইশতেহার অনুযায়ী সরকার এ উদ্যোগ নেয়। এ উদ্যোগের বেশ প্রশংসা রয়েছে দেশজুড়ে। শিক্ষার্থীরা পরিদর্শনে গেলে সেখানে বেশ পজিটিভ রেসপন্সও পায়। তবে কিছু অসংগতির কথাও উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সে আলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে। এরপর অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

এদিকে বণিক বার্তার অনুসন্ধানেও একই চিত্র উঠে এসেছে। দুর্যোগ সহনীয় ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অর্থের বিনিময়ে ঘরগুলো বিক্রি করেন। স্থানীয় প্রতিনিধিরা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে এসব ঘর বরাদ্দ দিচ্ছেন। লক্ষ্মীপুর, ফরিদপুর, ভোলা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়েও দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণে বেশকিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুর জেলায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ বরাদ্দ ছিল ২১৩টি। বরাদ্দকৃত এসব ঘর নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৫০ লাখ ৬৭ হাজার ১০৩ টাকা। সে হিসেবে ঘরপ্রতি বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩১ টাকা। যদিও এসব ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রে উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্তও গ্রহণের অভিযোগ করেছেন অনেকেই। স্থানীয় প্রতিনিধি ও একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা এসব টাকা ভাগ করে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

 

এ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী বলেন, মেম্বার (ইউপি সদস্য) ঘর দেয়ার কথা বলে ৮০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে ৬০ হাজার টাকা লোন নিয়ে ঘর নিই। কারণ আরো ২ লাখ টাকার মতো সুবিধা পাব। এ টাকার কথা যেন কেউ না জানে সে শর্ত দেয়া হয় বলে জানান তিনি।

 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে টিআর ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় ১৭ হাজার ৫টি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এজন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ৫১০ কোটি টাকা। গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় যেসব দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামান্য জমি বা ভিটা আছে, কিন্তু টেকসই ঘর নেই, তাদের জন্য ৮০০ বর্গফুট জায়গায় (প্রায় ২ শতাংশ জমি) রান্নাঘর ও টয়লেটসহ একটি সেমিপাকা টিনশেড গৃহ (দুই গৃহবিশিষ্ট) নির্মাণ করা হয়। কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচন বিষয়ে নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, গৃহহীন অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহীন পরিবার, বিধবা মহিলা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পরিবারে উপার্জনক্ষম সদস্য নেই এমন পরিবার বা অসহায় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা অগ্রাধিকার পাবেন।


এ জাতীয় আরো খবর