বুধবার, জুলাই ৮, ২০২০

রেসিডেন্ট তার বাহিনী সংগঠিত করলেন

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-০৯ ১৩:২৪:৫২
image

১৮৫৭ সাল। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখা দেয় সিপাহি বিদ্রোহের চেহারায়। যার ধারাবাহিকতায় অবসান ঘটে কোম্পানি শাসনের। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ। নিভে যায় মোগলদের শাসনপ্রদীপ। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্নেহধন্য কবি জহির দেহলভির ওই সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থকে ইংরেজিতে ‘দাস্তান-ই-গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনি’ নামে প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন র্যানডম হাউজ ইন্ডিয়া। সিপাহি বিদ্রোহের এ অমূল্য দলিলটিকে বাংলায় প্রকাশের স্বত্ব পেয়েছে বণিক বার্তা। শানজিদ অর্ণবের রূপান্তরে ধারাবাহিক আয়োজন—

রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি সম্রাটকে বললেন, ‘আমি তাদের কাছে অনুরোধ করার মাধ্যমে আমার দায়িত্ব সম্পন্ন করেছি। কিন্তু এরা আমার কথা মানতে আগ্রহী নয়। তারা মৃত্যুবরণ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছে। আমি গিয়ে তাদের জন্য সে ব্যবস্থা করব। ওদের গোলায় উড়িয়ে দেয়া হবে। ওদের বন্দোবস্ত করতে কোতোয়ালি প্লাটুনের ১ হাজার ৮০০ নাজিবই যথেষ্ট।’

বাদশাহ সালামত বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনার নিরাপত্তার জন্য আমার এখানকার কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যান।’

রেসিডেন্ট হেসে জবাব দিলেন, ‘এই মানুষরা দরবারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত। তাদের এখানেই থাকতে দিন দেওরহিকে নিরাপদে রাখতে। আপনার দেখানো এ সৌজন্যই আমার জন্য যথেষ্ট। দুশ্চিন্তা করবেন না। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

সাহেব রেসিডেন্ট বাহাদুর কিলেদারের সঙ্গে সম্রাটের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলেন। তারা লাল পর্দা দিয়ে বের হয়ে, বকশিগিরি চক হয়ে পর্দা দরজায় হাজির হলেন। সেখান থেকে তিনি দিওয়ান-ই-আম অতিক্রম করলেন। তারপর নকরখানা হয়ে নিজের গাড়িতে চড়লেন। সব ফটক বন্ধ রাখা এবং আজমেরি ফটকের সেনাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিলেন।

‘গুলিভরা বন্দুক নিয়ে সতর্ক অবস্থায় থাকবে। দেয়াল বরাবর টহল দেবে এবং বিদ্রোহী সেনারা ফটকের কাছে আসতে চাইলে তাদের উড়িয়ে দেবে। কার্তুজসহ অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করো। আমরা কলকাতা দরওয়াজা নিরাপদ রাখতে যাচ্ছি। সতর্ক থাকবে। ফটকের উপরের মিনারের দরজা বন্ধ রাখবে। শুধু ছোট দরজাটা খোলা থাকবে।’

এসব নির্দেশনা দেয়ার পর রেসিডেন্ট ও কিলেদার ফটক দিয়ে বেরিয়ে কলকাতা দরওয়াজায় পৌঁছলেন। তারা গিয়ে দেখলেন, সেটা নিরাপদ ও তালাবদ্ধ আছে। পুলিশের সঙ্গে সেখানে কোতোয়াল, থানেদার ও জমাদাররা উপস্থিত আছে। শ্যাহের পানাহর প্রাচীরের ওপর, কলকাতা ফটক থেকে মোয়াট দরওয়াজা পর্যন্ত নাজিবরা সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। নিগামবোড় দরওয়াজা ও কলকাতা দরওয়াজার কাছে শ্যাহের পানাহর ছোট বুর্জের ওপর একটি গোলাভরা কামান স্থাপন করা হয়েছিল। কামানটি সেতুর দিকে মুখ করে রাখা ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, বিদ্রোহী সেনারা এদিক দিয়েই আসবে। কারণ তাদের যমুনা নদী হয়ে আসতে হবে। পুরো নাজিব বাহিনী সেখানে প্রস্তুত ছিল বিদ্রোহীদের নগর থেকে দূরে রাখতে।

সব আয়োজন চূড়ান্ত, সবকিছুই সুশৃঙ্খল এবং বাহিনী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু কেউ জানত না, ভাগ্য তাদের জন্য কী বরাদ্দ রেখেছে।

পাঁচ সওয়ার

রেসিডেন্ট বাহাদুর কেল্লার দিকে রওনা হলেন। নিয়তি এবার পাশার নতুন দান ছুড়ে দিল। বিদ্রোহী অশ্বারোহীরা কলকাতা দরওয়াজার দিকে না গিয়ে রাজঘাট দরওয়াজার দিকে এগোল। সেখানে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে আমি কয়েকটা কাহিনী শুনেছিলাম।

অনেকে বলেন, দরজা বন্ধ ও সেখানে নাজিবদের পাহারা ছিল। অনেক মানুষ সেখানে ফটক খোলার অপেক্ষায় ছিল, যেন তারা যমুনায় সকালে তাদের ধর্মীয় রীতিমাফিক গোসল সেরে নিয়ে খেতে যেতে পারে। তারা সৈনিকদের সঙ্গে এ গোসলে যাওয়ার জন্য ফটক খোলা নিয়ে তর্ক করছিল।

দ্বাররক্ষকরা বলছিলেন, সরকারের অনুমতি ছাড়া এ ফটক খোলা যাবে না। শেষমেশ গোসলের অপেক্ষায় থাকা লোকজন ক্ষেপে গিয়ে ফটকের দিকে পাথর ছোড়া শুরু করল এবং তারপর ফটক খুলে দেয়া হলো।

নাকি ফটক আগে থেকেই খোলা ছিল? এ সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ নগরের সব দরজাই তালাবদ্ধ ছিল এবং কলকাতা দরওয়াজায় কড়া পাহারা ছিল। তাহলে এই একটা দরজা কীভাবে খোলা রইবে?

এ ফটক কীভাবে খোলা হয়েছিল, সেটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না।

সংক্ষেপে বললে রাজঘাট দরওয়াজা দিয়ে বাঘি সওয়াররা নগরে প্রবেশ করে। ফটক থেকে সড়ক পরিখা বরাবর চলে গিয়েছিল। দরিয়াগঞ্জ হয়ে এ সড়ক সুনেহরি মসজিদের সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে। সুনেহরি মসজিদের নিচে দুটি সড়ক একে অন্যকে অতিক্রম করেছে—লাল কেল্লার নিচ থেকে একটি গেছে লাল ডিগ্গিতে, অন্যটি গেছে বাজারে এবং এখান থেকেই কেল্লার নিচের সীমানা শুরু। দক্ষিণ দিকে দুটো রাস্তা আছে, যেগুলো দিল্লি দরওয়াজার দিকে গেছে। খাল থেকে আরেকটি রাস্তা দরিয়াগঞ্জের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চলে গেছে। এ রাস্তার মাথায় পাদ্রি সাহেবের বাড়ি। এ পাদ্রি হিন্দু ছিলেন, পরে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি দাঙ্গার প্রথম শিকার হলেন। সওয়াররা এসে তার বাড়ির বারান্দায় দাঁড়াল।

সওয়ার: ‘তুমি কে?’

পাদ্রি সাহেব: ‘পাদ্রি।’

সওয়ার: ‘মুসলমান নাকি হিন্দু?’

পাদ্রি সাহেব: ‘খ্রিস্টান।’

তিনি একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে এক সওয়ার ট্রিগার টিপে দিল, গুলির শব্দ বারান্দায় ধ্বনি তোলার সঙ্গে সঙ্গে পাদ্রির আত্মা অনন্তের উদ্দেশে যাত্রা করল। পাদ্রি সাহেব বারান্দায় একটি স্তূপের ওপর পড়ে গেলেন এবং ধ্বংসযজ্ঞের ভয়ানক চক্র উন্মুক্ত হলো। সওয়াররা পাদ্রির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল।

লাল ডিগ্গিতে পৌঁছে তারা হাসপাতালে প্রবেশ করে এবং সেখানকার ডাক্তারকে জেরা করল।

ডাক্তার চিমন লাল ছিলেন কায়স্থ। কিন্তু কিছুদিন আগেই তিনি এবং হাসপাতালের প্রধান রাম চন্দ্র খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। সওয়াররা ডাক্তার চিমন লালের মৃত্যুদূত হয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করেছিল। ঢুকেই তারা তাকে প্রশ্ন করতে শুরু করল।

‘তুমি কোন ধর্মের অনুসারী?’

‘আমি যিশুর অনুসারী’—ডাক্তার চিমন লাল বললেন।

সওয়াররা একটি গুলি খরচ করে তাকে পাদ্রির কাছে পাঠিয়ে দিল। এরপর তারা হাসপাতালে ভাংচুর করে সেটাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিল।

নগরের দুজন বিশিষ্ট নাগরিকের মৃত্যু সংবাদ শুকনো পাতায় লাগা আগুনের মতো দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ল। নগরের সব বদমাশ, চোর, পকেটমার, ছিঁচকে চোর, প্রতারক, ঠগ—যারা এমন সুযোগের অপেক্ষায় থাকত; তারা সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিল। এখন প্রতি সওয়ারের পিছু পিছু কমপক্ষে পঞ্চাশজন অসামাজিক অপরাধী চলতে শুরু করল।

সওয়াররা যখন জনগণের ওপর পীড়ন শুরু করেছিল, তখন এ বদমাশরা লুটপাট ও চুরিচামারিতে ব্যস্ত ছিল। তারা যেখানে গিয়েছে, সেখানেই ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন পেছনে রেখে গেছে। নগরে লাহোরি দরওয়াজা পর্যন্ত তারা হাতে করে নেয়া যায়, এমন যা কিছু পেয়েছে তা-ই তুলে নিয়েছে। লাহোরি দরওয়াজায় পৌঁছে বিদ্রোহীরা অনুসন্ধান শুরু করল, ‘ইংরেজরা কোথায়?’

কেউ বলল, সব ইংরেজ সেনা, থানেদার ও কোতোয়াল-ই-নাজিবান কলকাতা দরওয়াজায় জড়ো হয়েছে।

একথা শুনেই পাঁচজন সওয়ার তাদের ঘোড়া ঘুরিয়ে কলকাতা দরওয়াজার দিকে ছুটল। অন্যরা লাল ডিগ্গি সড়কে অবস্থিত দুর্গের সংলগ্ন পরিখার দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

পাঁচজন সওয়ার ঝড়ের বেগে কলকাতা দরওয়াজার দিকে ছুটল। এ ফটক যারা পাহারা দিচ্ছিল, তারা সওয়ারদের ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দে ভয়ে জমে গেল। সওয়ারদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে এক ইঞ্চিও কেউ এগোতে পারল না।

একজন দ্বাররক্ষক বলে উঠল, ‘ওহ, তারা এসে গেছে!’

সেখানে থাকা সবাই পালিয়ে গেল। ভয়ের এমন এক আবহ তৈরি হয়েছিল যে, কেউই সেই পাঁচজন সওয়ারকে আক্রমণ করার সাহস দেখায়নি। পাঁচ সওয়ার এমন দাপট দেখাল যে, ফটকের রক্ষীরা প্রাচীর থেকে লাফিয়ে পড়ে নিগামবোড় দরওয়াজার দিকে দৌড় দিল।

এরা যদি সওয়ারদের দিকে এক মুঠো করে ধুলোও ছুড়ে দিত, তাহলেও তারা সমাধিস্থ হয়ে যেত, কিন্তু অস্তাগফিরুল্লাহ! এদের মধ্যে কার এত সাহস ছিল যে, সওয়ারদের মুখোমুখি দাঁড়াবে? দৃশ্যটা যেন সেই গল্পের পুনরাবৃত্তি, যেখানে এক সিংহ ছাগলের পালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর তাদের উপায় ছিল শুধু পালিয়ে যাওয়া।

এবার মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু দুর্ভাগা রেসিডেন্ট বাহাদুর ও কিলেদার বাহাদুর সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। এছাড়া ডানা ঝাপটানোর জন্য একটা পাখিও সেখানে ছিল না।

পাঁচ সওয়ার রেসিডেন্ট বাহাদুরের গাড়ি ঘিরে ফেলল, কিন্তু রেসিডেন্ট বাহাদুরের সাহস ও স্নায়ুর শক্তি এত ছিল যে, তিনি বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না। বরং তিনি তার গাড়িকে সাহসের সঙ্গে কেল্লার দিকে ছোটালেন। তিনি চাবুক মেরে ঘোড়াগুলোকে দ্রুত দৌড় করালেন।

সওয়াররা রেসিডেন্ট সাহেবকে ধাওয়া করল, তাদের হাতে নাঙ্গা তরবারি। তাদের মনে তখন রেসিডেন্টকে খুন করা ভিন্ন কোনো ভাবনা নেই। একজন এগিয়ে গিয়ে তাকে আক্রমণ করল। রেসিডেন্ট বাহাদুর তার পিস্তল থেকে গুলি ছুড়লেন। গুলি সওয়ারের বুকে বিঁধে এবং সে তত্ক্ষণাৎ মারা যায়।

অন্য চার সওয়ার বলে ওঠে, ‘এবার তুমি আমাদের এক সঙ্গীকে হত্যা করলে, তোমাকে আমরা বাঁচতে দেব না।’

রেসিডেন্ট বাহাদুর কোনোমতে কেল্লার ফটকে পৌঁছে গেলেন। তিনি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে পকেট দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে ফটক বন্ধ করে দিলেন।

তিনি সেখানে উপস্থিত সেনাদের দিকে গর্জন করে উঠলেন, ‘তোমরা চেয়ে চেয়ে কী দেখছ? তোমরা এ বিদ্রোহীদের দিকে গুলি ছুড়ছ না কেন?’

তারপর তিনি ও কিলেদার লাহোরি ফটকের ছাট্টায় প্রবেশ করলেন এবং সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। কিলেদার ফটকের ওপর তার বাসায় পৌঁছে গেল। রেসিডেন্ট বাহাদুর মোটাসোটা মানুষ ছিলেন, তার পরও তিনি কিলেদারের পেছন পেছন উঠেছেন।

সওয়াররা ফটকের রক্ষীদের কাছে এসে বলল, ‘তোমরা কি ইমানদার নাকি ওই মানুষদের অনুসারী?’

রক্ষীরা বলল, ‘ইমানদার।’

‘তাহলে তোমরা ফটক আটকে রেখেছ কেন?’

রক্ষীরা সঙ্গে সঙ্গে ফটক খুলে দিল।

‘সাহেবরা কোথায় গেছে?’ সওয়াররা জিজ্ঞেস করল।

‘ফটকের মাথায়।’

সওয়াররা ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামল এবং লাগামগুলো রক্ষীদের হাতে দিয়ে দিল। তারা ছাট্টার দিকে উঠতে শুরু করল এবং সেখানে গিয়ে রেসিডেন্টকে পাকড়াও করে ফেলে। রেসিডেন্ট তখন সেখানে হাঁপাচ্ছিলেন।


এ জাতীয় আরো খবর