শনিবার, এপ্রিল ৪, ২০২০

আংরেজদের ওয়াদার ওপর আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-০৮ ১০:৩৪:০৯
image

১৮৫৭ সাল। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখা দেয় সিপাহি বিদ্রোহের চেহারায়। যার ধারাবাহিকতায় অবসান ঘটে কোম্পানি শাসনের। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ। নিভে যায় মোগলদের শাসনপ্রদীপ। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্নেহধন্য কবি জহির দেহলভির ওই সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থকে ইংরেজিতে ‘দাস্তান-ই-গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনি’ নামে প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন র্যানডম হাউজ ইন্ডিয়া। সিপাহি বিদ্রোহের এ অমূল্য দলিলটিকে বাংলায় প্রকাশের স্বত্ব পেয়েছে বণিক বার্তা। শানজিদ অর্ণবের রূপান্তরে ধারাবাহিক আয়োজন—

বাদশাহ জবাব দিলেন

নিয়তিকে মানুষ পরিকল্পনা করে মুছতে পারে না

আমাদের দুর্ভাগ্যকে বদলানো সম্ভব নয়

‘শোনো ভাই’—সম্রাট শুরু করলেন। ‘কে আমাকে বাদশাহ বলে ডাকে? আমি একজন ভিখারি, যে দুর্গের মধ্যে বংশধরদের সঙ্গে সুফি তরিকায় জীবনযাপন করে। সাম্রাজ্য সম্রাটদের সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে। আমার পূর্বপুরুষরা ছিলেন সম্রাট, হিন্দুস্তান ছিল তাদের শাসনাধীন। কিন্তু আমাদের রাজত্ব ১০০ বছর আগেই প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেছে। ‘যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের অধীন চাকরি করতেন, তারা নিজেরাই এখন স্বাধীন অভিজাত, এজন্য আমার পূর্বপুরুষদের উদারতা ও পৃষ্ঠপোষকতাকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। আমার ঘর রিক্ত হয়ে পড়ে, যখন থেকে পূর্বপুরুষ হজরত শাহ আলম বাদশাহ গাজী অকৃতজ্ঞ আবদুল কাদিরো হাতে বন্দি হন এবং তাকে অন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর মারাঠারা এসে কাদিরকে তার নির্মম কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিল এবং হজরত বাদশাহকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করল। কয়েক বছর ধরে মারাঠারা সম্রাটের পক্ষে শাসন করে, কিন্তু তারা সম্রাটের প্রাসাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার মতো ব্যবস্থাও করতে পারত না। তখন আমার পিতামহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে যান। তিনি ব্রিটিশদের ডেকে তাদের বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক করেন, হিন্দুস্তানকে তাদের হাতে ভরসা নিয়ে সঁপে দেন। তারা সম্রাটের চাহিদামতো রাজকীয় খরচের ব্যবস্থা ও দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেদিন থেকে আজ অবধি আমরা শান্তি ও বিলাসে দিনযাপন করছিলাম। আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা কিংবা সমস্যা ছিল না। আমাদের কোনো লড়াই করতে হয়নি। যেকোনো ঝগড়া-লড়াইকে ব্রিটিশরা প্রতিরোধ ও দমন করে রেখেছিল।

 

‘আমি একজন নিভৃতচারী মানুষ। তোমরা এখন আমাকে কেন ঝামেলায় ফেলতে এসেছে? তোমাদের বেতন দেয়ার মতো কোনো সম্পদ আমার কোষাগারে নেই। আমার এমন কোনো সেনাবাহিনী নেই, যারা তোমাদের সাহায্য করতে পারে। আমার কোনো জমিদারি নেই, যেখানকার রাজস্ব দিয়ে আমি তোমাদের চাকরি দিতে পারি। আমি কিছুই করতে পারব না। আমার কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার স্বপ্ন দেখো না। এটা তোমাদের ও ব্রিটিশদের মধ্যকার বিষয়। হ্যাঁ, আমার আওতায় শুধু একটি বিষয় আছে। দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আনয়নে আমি মধ্যস্থতা করতে পারি। তোমরা এখানে অপেক্ষা করতে পারো। আমি রেসিডেন্ট সাহেবকে৬০ ডেকে পাঠিয়েছি। তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। তার সঙ্গে কথা বলে দেখি, তিনি পরিস্থিতি সম্পর্কে কী জানেন এবং আল্লাহ চাইলে আমি তোমাদের মধ্যকার বিবাদ মিটিয়ে দেব।’ রেসিডেন্ট ফ্রেজার সাহেব কিলেদারের সঙ্গে প্রবেশের সময়ও এ আলোচনা অব্যাহত ছিল। খাজা-সারা কুর্নিশ সালামের মাধ্যমে সম্মান দেখাল। ভেতর থেকে আদেশ এল যেন উভয় কর্মকর্তাই প্রাসাদে হাজির হন। তাই রেসিডেন্ট বাহাদুর, কিলেদার সাহেব, হাকিম আহসানউল্লাহ খান ও মেহবুব আলী খান সম্রাটের উপস্থিতিতে রাজকীয় কোয়ার্টারে প্রবেশ করলেন।

 

সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী সমস্যা এ রকম উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করল? ধর্মীয় লড়াই কীভাবে মাথা তুলল? এটা ইমান ও নীতির প্রশ্ন। ধর্মীয় নিপীড়ন ও গোঁড়ামি খুব খারাপ বিষয়। অনেক রাজত্ব এসব কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। অগণিত মানুষ এ কারণে নিহত হয়েছে। এ সমস্যা অতি দ্রুত সমাধান করা জরুরি। ‘ঈশ্বর রাষ্ট্রে রাজদ্রোহ ও দাঙ্গা ছড়ানো নিষেধ করেছেন। কারণ তাতে অগণিত মানুষ খুন হয় এবং রাজস্বের বিরাট ক্ষতি হয়। চলমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। যতদূর সম্ভব আমাদের উচিত মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করা এবং নম্র ব্যবহার করা। এ মানুষেরা মূর্খ। কারো উচিত তাদের বোঝানো, যেন তারা এসব থেকে বিরত থাকে। আমি বিস্মিত যে, আপনি এখনো সমস্যাটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।’ রেসিডেন্ট বলে উঠলেন, ‘হুজুর, আপনার অনুগত রাত এগারোটায় একটি চিঠি পেয়েছে। কিন্তু সে সময় আমি ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম, তাই চিঠিটির দিকে মনোযোগ দিইনি। মনে হয়েছিল এটা প্রতিদিনের মতো কোনো একটি সাধারণ চিঠি। চিঠিটা পকেটে রেখে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে আপনার বার্তাবাহক আমার বাসায় যায়। তখন চিঠিটি পড়ে আমি পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হই।

 

‘হুজুর, চিন্তা করবেন না, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। এরা দাঙ্গাকারী। তারা আর কী করতে পারে? আপনার অধীনে সব সমস্যার সমাধান খুব শিগগিরই হয়ে যাবে। আপনার এ গোলাম বাইরে গিয়ে তাদের নিবৃত্ত হতে বলবে। ঈশ্বর চাইলে এ ফ্যাসাদ আর দীর্ঘায়িত হবে না।’ একথা বলে রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন এবং তসবিহখানার চত্বরে হাজির হলেন যেখানে সভাসদরা দরবারের দিকে মুখ করে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাকিম আহসানউল্লাহ খানের পুত্র ও কিলেদারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

বিদ্রোহীদের মুখোমুখি দাঁড়ালেন রেসিডেন্ট

‘কিউ (কেন) বাবা লোগ? এটা আপনারা কেমন রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজ করলেন?’ রেসিডেন্ট জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমরা আপনাদের অত্যন্ত যত্ন নিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, যদি কখনো রুশরা হিন্দুস্তানের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে আমরা তাদের ধ্বংস করে দেব। আর যদি ইরান এক পা এগোয়, তাহলে আমরা তাদের মাটিতে মিশিয়ে দেব। যদি কোনো সাম্রাজ্য কখনো হিন্দুস্তানকে হুমকি দেয়, তাহলে আমরা উপযুক্ত জবাব দেব। কিন্তু আমরা কখনো ভাবিনি, আমাদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াতে প্রস্তুত আছে। কিউ বাবা লোগ? আনুগত্যের অর্থ কি আজ তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে? আমরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে তোমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি কি এ মুহূর্তটির জন্য?’

 

সাওয়ারান-ই-ফৌজ বাঘিয়া বলে উঠল, ‘হুজুর, আপনি ঠিক কথা বলছেন। কোনো সন্দেহ নেই, সরকার আমাদের প্রশিক্ষণ ও চাকরি দিয়েছে। সরকার আমাদের যে উপকার করেছে, তা আমরা কখনো ভুলব না। আজকের আগের দিন পর্যন্ত আমরা কখনো আপনাদের প্রতি আনুগত্যে গাফিলতি করিনি। সরকার আমাদের যেখানে যেতে বলেছে, আমরা চোখ বন্ধ করে আগুনে বা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমরা কখনো নিজেদের জীবনের পরোয়া করিনি; জীবন দিতে আমরা কখনো পিছু হটিনি।

 

‘আমরাই কাবুল পর্যন্ত কুচকাওয়াজ করেছি। আমরা আপনাদের লাহোর জয় করে দিয়েছি। আমরা আপনাদের জন্য কলকাতা থেকে কাবুল পর্যন্ত যুদ্ধ করেছি, জীবন দিয়েছি। নিজেদের মস্তক কেটে আমরা আনুগত্যের পরীক্ষা দিয়েছি। এখন যখন সরকার পুরো হিন্দুস্তানের ওপর কবজা করেছে, তখন আপনারা আমাদের বিশ্বাস ও নীতির ওপর নজর দিয়েছেন। আপনারা আমাদের খ্রিস্টান করতে চান। আমাদের কার্তুজ দাঁত দিয়ে কাটার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা কীভাবে আমাদের বিশ্বাস বিসর্জন দিতে পারি? আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু আমাদের ধর্ম নয়। সরকার আমাদের সঙ্গে চাইলে যা খুশি করতে পারে। আমরা মরতে প্রস্তুত আছি, কারাগার ভেঙে কর্মকর্তাদের মুক্ত করার সময়ই আমরা নিজেদের মৃত ভেবে রেখেছি।’

 

রেসিডেন্ট বললেন, ‘শুনো, শুনো, বাবা লোগ! এসব চিন্তা বাদ দাও এবং আমাদের হত্যা করা বন্ধ করো। তাহলে তোমাদেরও কেউ মারবে না। আমি এখন থেকে তোমাদের মধ্যস্থতাকারী এবং ঈশ্বরকে সাক্ষী মেনে তোমাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি, আমরা তোমাদের ধোঁকা দেব না এবং তোমাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব। তাদের শাস্তি দেয়া হবে, যারা এ সমস্যা সৃষ্টি করেছে। আমরা তাদের প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে বলব। শুধু এ হত্যাযজ্ঞ, দাঙ্গা ও লুটপাট বন্ধ করো। ‘সম্রাটও তোমাদের একই নির্দেশনা দিয়েছেন। তোমাদের বিশ্বাসে আঘাত এসেছে এবং আমরা তোমাদের এ সমস্যা সমাধানে সাহায্য করব। সম্রাট নিজেই তোমাদের পক্ষের মধ্যস্থতাকারী হবেন।’ সওয়ার রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে বলল, ‘ও গরিবের রক্ষাকর্তা! আমরা সরকারের কথা বিশ্বাস করি না। তারা দখল ও জয় করতে মাঝেমধেই আমাদের ধোঁকা দিয়েছে। ধরুন আমরা সব শর্ত মেনে নিলাম, কিন্তু কাল যদি তার পরও আমাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয়, তাহলে কী হবে? তাই আমরা তরবারির আঘাতে মরতে রাজি আছি, কিন্তু কোন নীচু জাতের মানুষের হাতে ফাঁসিতে ঝুলতে রাজি নই।’

 

রেসিডেন্ট সঙ্গে সঙ্গে তাদের পুনরায় আশ্বস্ত করলেন, ‘না, না, দয়া করে এমন করে ভেবো না! আমি বাইবেলের নামে শপথ করে বলছি, আমরা কখনো তোমাদের ধোঁকা দেব না এবং সম্রাটও এমনটাই বলছেন।’ সওয়ারদের মধ্যে প্রাজ্ঞ কয়েকজন বলল, ‘হ্যাঁ, রেসিডেন্ট বাহাদুর সাহেব সত্য কথাই বলছেন। আমাদের উচিত তাদের শর্ত মেনে নেয়া।’ কিন্তু কিছু মূর্খ, দূরদৃষ্টিহীন সওয়ারও ছিল, যারা হত্যালীলা ও লুটপাটে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তারা বলল, ‘আংরেজদের ওয়াদার ওপর আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই। তারা ওয়াদা ভঙ্গ করে। তারা খ্রিস্টান।’ সওয়ারদের দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্ক শুরু হলো। কারণ অর্ধেক চাচ্ছিল রেসিডেন্টের কথা মেনে নিতে (তারা বলছিল, শত হলেও তারাই এখনকার শাসক এবং দিল্লির মালিক। তারা আমাদের প্রতারণা করবে না), কিন্তু অন্যরা কঠোর অবস্থানে ছিল যে, তারা কোনো অবস্থায়ই কোনো শর্ত মানবে না।

 

শেষমেশ এক অকৃতী সিপাহি বলে উঠল, ‘অপেক্ষা করুন, আমি বিষয়টা এখানেই ফয়সালা করে দিচ্ছি,’ এবং বন্দুক তুলে রেসিডেন্টকে গুলি করল। কিন্তু রেসিডেন্টের মরণের সময় তখনো আসেনি, গুলি তার ও হাকিম আহসানউল্লাহর মধ্য দিয়ে বাতাসে শিস কেটে বেরিয়ে গেল। গুলিটা গিয়ে বিঁধল তসবিহখানার একটি স্তম্ভে, মার্বেলের একটি টুকরো খসে পড়ল। আপনারা চাইলে এখনো স্তম্ভটির গায়ে সেই ক্ষত দেখতে পাবেন।

 

হাকিম আহসানউল্লাহ খান রেসিডেন্টকে টেনে তার পেছনে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘এরা সহজে আমাদের কথা মানবে না। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। এখন আমাদের এ ঝামেলা দমন করার নতুন পথ খুঁজতে হবে।’


এ জাতীয় আরো খবর