শনিবার, এপ্রিল ৪, ২০২০

মুলক বাদশাহ কা হুকুম কোম্পানি কা

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-০৭ ১৬:৪৪:২৫
image

১৮৫৭ সাল। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখা দেয় সিপাহি বিদ্রোহের চেহারায়। যার ধারাবাহিকতায় অবসান ঘটে কোম্পানি শাসনের। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ। নিভে যায় মোগলদের শাসনপ্রদীপ। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্নেহধন্য কবি জহির দেহলভির ওই সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থকে ইংরেজিতে ‘দাস্তান-ই-গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনি’ নামে প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন র্যানডম হাউজ ইন্ডিয়া। সিপাহি বিদ্রোহের এ অমূল্য দলিলটিকে বাংলায় প্রকাশের স্বত্ব পেয়েছে বণিক বার্তা। শানজিদ অর্ণবের রূপান্তরে ধারাবাহিক আয়োজন—

 

সামান বুর্জের বারান্দা থেকে সম্রাট মীর ফতেহ আলী ও হামিদ খানকে নির্দেশ দিলেন, ‘তোমাদের সেনাদল নিয়ে সেতুটা ধ্বংস করে দাও। নৌকাগুলো পাড়ে তুলে ফেলো, ওই সেনাদের পাড়ে নামতে দিও না। নগর ফটক বন্ধ করে দাও। বড় সাহেবকে আনতে অশ্বারোহী পাঠাও। সব রাজকর্মচারী ও সভাসদকে এখনই দরবারে হাজির হতে হবে। কোতোয়ালদের ফটক পাহারা দিতে নির্দেশ দাও এবং তাকে কলকাতা দরওয়াজায় স্বয়ং থাকতে বলো। কিলেদারদের কেল্লার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলো। অশ্বারোহী প্রেরণ করো এবং তাদের রাজঘাট দরওয়াজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দাও।’ সম্রাটের নির্দেশাবলি তত্ক্ষণাত্ বাস্তবায়ন করা হয়। সবদিকে অশ্বারোহীদের প্রেরণ করা হয়, কিন্তু সেতু ধ্বংস করতে যাওয়া দলটি ব্যর্থ হয়েছিল। তারা তখনো সালিমগড়ের নিচে এবং দেখতে পায়, ঘোড়সওয়াররা নৌকার সেতু থেকে তাদের দিকে মৃত্যুদূতের মতো এগিয়ে আসছে। তারা প্রবেশপথটা কেটে দেন। তারা বাঘি সওয়াররা পৌঁছার আগেই ঝারোখার দেওরহিতে প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর ছাট্টা চকে প্রবেশ করে তারা দরজা বন্ধ করে দেয় এবং নিজেরা দিওয়ান-ই-খাস ও তসবিহখানায় হাজিরা দেয়।

 

হজরত কাদর-ই-কুদরত জিল-উল-লাহু বাদশাহ রাইয়াত পানাহ দারুণ সাহস ও উপস্থিত দৃঢ়তা দেখালেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা ছিল তার স্বভাব। তিনি এক ইঞ্চিও নড়লেন না। কিন্তু হেরেম ও শিবিরের নারীদের মধ্যে শোরগোল উঠল। সম্রাটকেই অন্যদের শান্ত করতে হলো। বাঘি সওয়াররা নৌকার সেতু থেকে নেমে এসে সালিমগড়ের নিচ দিয়ে জের-ই-ঝারোখায় পৌঁছল। তারা সবাই কলকাতা দরওয়াজার দিকে ছুটে গেয়ে সম্রাটকে ডাকাডাকি শুরু করে। তারা ফটকের প্রহরীকে বলল তালা লাগিয়ে দিতে। এর মধ্যে নিগামবোড় দরওয়াজার রক্ষীরা খবর পেয়ে গিয়েছিল। যারা গোসল করতে গিয়েছিল, তারা ছুটে এসে কোনোমতে নগরে প্রবেশ করে। এ ফটকটিও তালাবদ্ধ করা হয়েছিল। এ বিরতিতে মেহবুব আলী খান খাজা-সারা ও হাকিম আহসানউল্লাহ খান সম্রাটের সামনে হাজির হলেন। অকৃতজ্ঞ সওয়াররা আকাশ থেকে মহামারীর মতো নেমে আসার পর হুজুর আনওয়ার তাদের ডেকে পাঠান। সেই সওয়াররা জের-ই-ঝারোখায় জড়ো হয় এবং সেখানেই অবস্থান নেয়। সৌজন্য অনুসারে তারা ঝুঁকে সম্রাটকে সালাম জানাল। হুজুর হাকিম আহসানউল্লাহ খানকে নির্দেশ দিলেন বিদ্রোহীদের পরিচয় এবং তারা কোত্থেকে আসছে তা জানতে। তাছাড়া তারা কার বেতনভুক্ত এবং কেন দিল্লি এসেছে, তাও জিজ্ঞেস করতে নির্দেশ দিলেন।

 

হাকিম আহসানউল্লাহ খান তসবিহখানায় গেলেন এবং তাদের প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। কয়েকজন বিদ্রোহী সেনা ঘোড়া থেকে নেমে এক সারিতে দাঁড়াল। তারা হাত গুটিয়ে মিনতি করতে শুরু করে এবং জের-ই-ঝারোখার দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বিদ্রোহী সেনাদের বক্তব্য ‘হুজুর জাঁহাপনা! আপনি দীর্ঘজীবী হোন! আপনি ইমান ও দুনিয়ার সম্রাট। ঈশ্বর আপনাকে ২২টি প্রদেশের শাসনক্ষমতা দিয়েছেন। পুরো ভারতবর্ষ আপনার অধীন। হিন্দুস্তানের সব মানুষ আপনার প্রজা হিসেবে বিবেচিত হয়।’ তখন পর্যন্ত বিদ্রোহীদের ইশতেহারের ঘোষণা ছিল, খিলকাত খুদা কি, মুলক বাদশাহ কা, হুকুম কোম্পানি কা (সৃষ্টি খোদার, দেশ সম্রাটের, সৈনাপত্য কোম্পানির)। ‘কিন্তু এখন আপনার নির্দেশে ব্রিটিশরা আমাদের শাসন করার ক্ষমতা পেয়েছে। তাই আমরা আপনার কাছে ন্যায়বিচারের জন্য আরজি নিয়ে এসেছি। ‘আমরা ব্রিটিশদের চাকরি করি। তারা ইংল্যান্ড থেকে কোনো সেনাদল নিয়ে এখানে আসেনি। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে কলকাতা থেকে কাবুল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছি। তাদের সব বিজয় সম্ভব হয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কারণেই। আমরা আমাদের মেডেল ও ব্যাজগুলো প্রমাণস্বরূপ দেখাতে পারি।

 

‘এখন ব্রিটিশরা হিন্দুস্তানের প্রতিটি অংশের ওপর তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়নি এমন কেউ আর বাকি নেই। কোম্পানির নিয়তে ঝামেলা দেখা যাচ্ছে। তারা আমাদের ইমান, ধর্ম ধ্বংস করতে চায়, তারা চায় পুরো হিন্দুস্তানকে খ্রিস্টান দেশে রূপান্তর করতে। তারা এ ধর্মান্তর শুরু করতে চায় সেনাবাহিনী থেকে। তাই নানা ফন্দিফিকির করে তারা এক নতুন ধরনের রাইফেল তৈরি করেছে, যার কার্তুজ দাঁত দিয়ে কাটতে হয়। এ কার্তুজে পশুর চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু আমরা জানি না, কোন পশুর চর্বি। রাইফেলগুলো আমাদের দেয়া হয়েছে এবং নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহারের আদেশ জারি হয়েছে। আমরা হিন্দু ও মুসলিম সেনারা এ আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছি এবং আমরা জানিয়েছি, কোনো অবস্থায়ই আমরা এ আদেশ পালন করব না। তাতে তারা আমাদের চাকরিচ্যুত করলেও কিছু আসে যায় না। হিন্দুদের আশঙ্কা এ কার্তুজের আবরণ গরুর চর্বি থেকে তৈরি আর মুসলিমদের আশঙ্কা এতে শূকরের চর্বি আছে। হিন্দু সেনারা জানিয়েছে, তারা বেশির ভাগই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় নয়তো উঁচু বর্ণের মানুষ এবং তারা কোনো অবস্থায়ই পশুর মাংস তাদের ঠোঁটে স্পর্শ করবে না। আর মুসলমানরা বলছে, তারা হালাল মাংস ছাড়া অন্য কোনো মাংসকে তাদের ঠোঁটে লাগাবে না। আর যেহেতু আমরা জানি না, কার্তুজের চর্বি হালাল না হারাম, তাই আমরা এ কার্তুজ ব্যবহার করতে পারি না।

 

‘আমরা ব্রিটিশদের আদেশ মানব না। এ আদেশ অমান্য করায় সরকার ভাববে, সেনারা তাদের সরাসরি একটি আদেশকে অবজ্ঞা করছে এবং যদি এজন্য তারা আমাদের কঠোর শাস্তি না দেয়, তাহলে তাদের সরকারকে সবাই দুর্বল বিবেচনা করবে। ‘এ ঝামেলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, চার মাস ধরে চলছে। কর্তৃপক্ষ এখন কমিটি গঠন করছে। কিন্তু পদাতিক ও অশ্বারোহী সেনাদের ক্যান্টনমেন্টে আমাদের মধ্যে চিঠি চালাচালি হচ্ছে; চিঠিতে বলা হচ্ছে, পুরো সেনাবাহিনীর উচিত হবে আদেশ প্রত্যাখ্যান করা এবং দায়িত্ব পালন না করা। আর যদি বেশি নির্যাতন করা হয়, তাহলে কোনো একটা নির্দিষ্ট দিনে হিন্দুস্তানজুড়ে আমরা বিদ্রোহ করব। দেখা যাক, তখন তারা কী করতে পারে! এখন সে বিদ্রোহের সময় এসে গেছে। পুরো সেনাবাহিনী উঠে দাঁড়িয়েছে এবং নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

 

‘এ বিদ্রোহের বীজ তখনই বপন হয়ে গিয়েছিল, যখন ব্রিটিশ কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এ রাজদ্রোহ দমন শুরু হবে মীরাট থেকে। কারণ এটা মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত এবং এখানে পুরনো ও বিরাট ক্যান্টনমেন্ট রয়েছে। তারা ভেবেছিল, একবার এখানকার সেনারা কার্তুজে দাঁত ছোঁয়ালেই আর কোনো সেনা আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানাতে পারবে না। তারা এ উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট দিনে এবং সময়ে কুচকাওয়াজের আয়োজন করে। কুচকাওয়াজের মাঠে গোলন্দাজ ও একই সঙ্গে তৃতীয় অশ্বারোহী বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়। স্কোয়াড্রনের কর্মকর্তাদের রাইফেল দেয়া হয় এবং কার্তুজে কামড় দিয়ে রাইফেল লোড করার নির্দেশ জারি হয়। ‘কর্মকর্তারা নির্দেশ মানতে তাদের অপারগতার কথা জানান। ‘হুজুর, আমাদের ক্ষমা করুন। সরকার আমাদের কামানের গোলায় উড়িয়ে দিলেও আমরা নিজেদের বিশ্বাস ত্যাগ করতে পারব না—সেনারা বলে। ‘এর পরও আবারো তাদের কার্তুজে কামড় দেয়ার আদেশ দেয়া হয়। পরিকল্পনামতো সেনারা আবারো আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানায়। আবার একই আদেশ দেয়া হলো এবং সেনারা আবারো তাদের অপারগতার কথা জানাল।

 

‘পরের আদেশ ছিল আমাদের অস্ত্র সমর্পণ করার। ‘আমরা তাদের অস্ত্র ফেলে দিলাম এবং তখন আদেশ এল, ঘোড়া থেকে নেমে এসো। ‘আমরা ঘোড়া থেকে নামলাম এবং তখন বলা হলো, কর্মকর্তারা অবশ্যই সৈনিকদের থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়াও। ‘চুরাশিজন কর্মকর্তা তাদের দল থেকে পৃথক হয়ে দাঁড়ালেন। এরপর নির্দেশ দেয়া হলো, এদের হ্যান্ডকাফ পরাও। ‘আমরা হাসিখুশি পরিবেশেই তাদের হ্যান্ডকাফ পরালাম, কোনো গোলযোগ করিনি। এরপর আদেশ এল, তোমাদের রাজদ্রোহের জন্য শাস্তি পাবে। তোমরা সবাই কারাগারে যাবে। আমরা কমান্ডারদের স্যালুট জানালাম এবং কারাগারে গেলাম।’ ঘুরপাক খেতে থাকা নিয়তির আসমান প্রতারক ও ধোঁকাবাজ মানুষকে বিপদে ফেলতে সে হাজারটা অজুহাত খুঁজে নেয়‘ আমরা কারাগারে ঢোকার পরই ক্যান্টনমেন্টে একটা উত্তেজনা তৈরি হলো। প্রত্যেক ঘরেই দলবদ্ধ আলাপ-বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। বিশেষত নারীদের মধ্যে, যদিও তাদের বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা কম এবং দীর্ঘমেয়াদের পরিণতি তারা ভাবতে পারে না। অনেক নারী তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। তারা তাদের বক্রোক্তি ও ব্যঙ্গোক্তি দিয়ে বিদ্রোহের আগুনে বাতাস দিয়েছিল। তাদের মুখ নিঃসৃত শব্দ বিদ্রোহের আগুনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।

 

‘আপনারা পুরুষ এবং নিজেদের সেনা বলে দাবি করেন’—নারীরা বলে। ‘তার পরও আপনারা ভীরু, নির্লজ্জ ও কলঙ্কিত। আমরা নারীরা আপনাদের চেয়ে উন্নত মানুষ। আপনাদের কর্মকর্তাদের হ্যান্ডকাফ পরানো হলো আর আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন, কিছুই করতে পারলেন না, আপনাদের লজ্জা করে না? এ চুড়িগুলো হাতে পরুন আর আপনাদের অস্ত্রগুলো আমাদের দিন। আমরা কর্মকর্তাদের মুক্ত করে ফিরিয়ে আনব। এ অনলবর্ষী শব্দগুলো সৈনিকদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল এবং পুরো সেনাবাহিনী বীরত্ব, সাহসিকতা আর পৌরুষত্বের আগুনে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এবার তারা মারতে নয়তো মরতে প্রস্তুত। অনেক আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সন্ধ্যার পর কারাগার ভেঙে কর্মকর্তাদের মুক্ত করে আনা হবে।

‘সন্ধ্যার পর পদাতিক ও অশ্বারোহী সেনারা কারাগারে হামলা চালায় এবং বন্দি চুরাশিজন কর্মকর্তাকে মুক্ত করে আনে। তারা কর্মকর্তাদের হ্যান্ডকাফ ও শিকল কেটে দেয়। একই সঙ্গে কারাগারে আটক চোর, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী, ডাকাত, খুনি ও ঠগীদের মুক্ত করে দেয়া হয়। শহরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে; শুরু হয় সহিংসতা ও খুনোখুনি। সরকার তাদের কর্মকর্তাদের অস্ত্র ধারণ করতে এবং সবসময় সতর্ক থাকার নির্দেশনা জারি করে। কামান বের করা হয় এবং সবদিকেই কামানের গোলাবর্ষণ হতে থাকে। তারপর ভারতীয় সেনাদের পক্ষ থেকে অনবরত গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সারা রাত আমরা গোরাদের সঙ্গে লড়াই করেছি। ভোরে আমরা দিল্লির উদ্দেশে রওনা হই। ৩০ কোশ পথ পেরিয়ে আমরা এখন দিল্লিতে পৌঁছেছি।

‘বাদশাহ সালামত, অনুগ্রহ করে আপনার হাত আমাদের মাথার ওপর রাখুন এবং আমাদের ন্যায়বিচার দিন। হাম দ্বীন পার বিগাড় কার আয়ে হ্যায়। (আমাদের ইমান নষ্ট হয়ে গেছে)’


এ জাতীয় আরো খবর