রবিবার, জুন ৭, ২০২০

আলো ছড়াচ্ছে দক্ষিণের বাতিঘর

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-০২ ১১:৪৩:০২
image

বরিশালের বুক চিরে নেমে এসেছে এক জাদুকাটা নদী কীর্তনখোলা। প্রতিনিয়ত পালতোলা নৌকা, শত শত বালি-কয়লার জাহাজ আর শ্রমিকের জীবনযুদ্ধ চলে এ নদীতে। নদীর ওপর নির্মিত শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতুর ওপর দাঁড়ালেই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য হাতছানি দিয়ে ডাকে। চারদিকে ঘন সবুজের সমারোহ। সেতু থেকে নেমেই বামে বিশ্ববিদ্যালয়। হাইওয়ে সংলগ্ন হওয়ায় পথযাত্রীরা জানালা দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর দিকে। বলছিলাম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা।

 

অগ্রযাত্রার দশম বর্ষে পদার্পণ করেছে দক্ষিণবঙ্গের বাতিঘর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি ছয়টি বিভাগে ৪০০ শিক্ষার্থী ও ১৪ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা করা বিশ্ববিদ্যালয়টির আজকের শিক্ষক সংখ্যা ১৯৩ জন। ছয় অনুষদ ও ২৪টি বিভাগ মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। কীর্তনখোলার এই তীরে গোধূলির আকাশ কখনো বিষাদ হয় না। সন্ধ্যায় শহীদ মিনার, মুক্তমঞ্চে জমে গানের আড্ডা। মুক্তমঞ্চের নির্মল বাতাস আর গানের সুরতান মুহূর্তেই দূর করে দেয় প্রাণের সব বিষণ্নতা। ভোরবেলা ভোলা রোডসংলগ্ন বঙ্গবন্ধু হলের রুমগুলোর সব নীরবতা ফালি ফালি করে চিরে দেয় শালিকের গান। ক্যাম্পাসে ভোরের আকাশটা অন্য রকম। সূর্যরশ্মির আলোছায়া ধরা দেয় প্রতিটি বালুকণায়।

 

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দক্ষ, মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বর্তমান শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নানামুখী সাফল্য ও কৃতিত্বের সাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে। পরিণত হয়েছে হাজারো শিক্ষার্থীর আস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এখন ক্যাম্পাসটি রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘র্যাগিং, মাদক ও ধূমপানমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ ক্যাম্পাস’ ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে অধূমপায়ীদের অগ্রাধিকার দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়টির তরুণ শিক্ষার্থীরা অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিয়ে এসেছেন একাধিক সাফল্য। বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যদল জাতীয় পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। ‘দ্বীন দ্য ডে’ সিনেমার জন্য সারা দেশ থেকে মুনসুন ফিল্মসের ট্যালেন্ট হান্ট রিয়ালিটি শোতে অ্যান্টি হিরো ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয় নাট্যদলের রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের (সিএসই) শিক্ষার্থীরা কৃষিকাজে ব্যবহার উপযোগী ড্রোন উদ্ভাবনে সফল হয়েছেন। ড্রোন দিয়ে জমির ছবি ধারণ, নির্দিষ্ট দূরত্বে বা প্রত্যন্ত এলাকায় অনাবাদি কিংবা কম ফলনশীল জমির অবস্থা নিরূপণ এবং পরবর্তী সময়ে এসব ছবি বিশ্লেষণ করে বের করা যাবে এসব জমি কেন অনাবাদি, কী পরিমাণ চাষাবাদ হচ্ছে, সমস্যাটা কোথায়, কীভাবে আবাদযোগ্য করা যায়। ফসলে কোনো ধরনের পোকা বা জীবাণু আক্রমণ করেছে কিনা, তা-ও শনাক্ত করা যাবে। ড্রোনের মাধ্যমে বিশাল জমিতে নিখুঁতভাবে সার বা কীটনাশক দেয়ার কাজটিও করা যাবে। ড্রোন দিয়ে কৃষিক্ষেত্রে এ রকম নানা সমস্যা চিহ্নিত করে গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের জন্য কাজ করা যাবে।


বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্রীড়া অঙ্গনেও রয়েছে অসামান্য সাফল্য। সাংস্কৃতিক চর্চায় রয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রতিভার বিকাশ। ক্যাম্পাস সূচনার পর থেকে ঘরে-বাইরে খেলাধুলায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, বিভিন্ন অলিম্পিয়াড, বইমেলা, কবিতা উৎসব, পিঠা উৎসব, ফুচকা ফেস্ট, উদ্যোক্তা মেলাসহ নানা আয়োজনে ক্যাম্পাস মুখরিত থাকে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ডিবেটিং সোসাইটি ও নাট্যদল। বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, পেশাভিত্তিক উন্নয়নের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানেও রয়েছে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। ইয়ুথ ফেস্ট, বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম, নাসা অ্যাপসের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় রয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্জন। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত স্পাইক এশিয়া ফেস্টিভ্যাল অব ক্রিয়েটিভিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গোলাম রব্বানী।

 

গত ২২ ফেব্রুয়ারি বর্ণাঢ্য আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়টি নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. ইয়ামিন চৌধুরী, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ইউনুস, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দীন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আরিফ হোসেন, ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক ড. খোরশেদ আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

 

এরপর বের হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের নবাগত শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। সভায় নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে উপাচার্য অধ্যাপক মো. ছাদেকুল আরেফিন দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, নিয়মের মধ্যে থাকা, সময় মেনে চলা, হতাশ না হওয়া এবং সততার চর্চা করা জীবনের এ চার জিনিস মনে রাখার চেষ্টা করবে। প্রতিনিয়ত সময়টাকে গুরুত্ব দিয়ে সময়ের কাজ সময়ে করার চেষ্টা করবে। সময়টাকে যদি গুরুত্ব দাও, তাহলে শুধু ক্লাসে নয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফল হবে। জীবনে হতাশা আসবে, কিন্তু হতাশাকে ওভারকাম করতে হবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সততার চর্চা অব্যাহত রাখবে।

 

উপাচার্য বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ও শিক্ষার মান উন্নয়নে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা দরকার, সেই লক্ষ্যেই চেষ্টা করে যাব। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে এটাই আমার প্রতিশ্রুতি।

 

শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফ হোসেন বলেন, ‘এরই মধ্যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ব্যাচ পড়ালেখা শেষ করে চাকরি জীবনে পদার্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করছেন। কেউ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আবার কেউ সরকারি বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকরা আধুনিক যুগোপযোগী পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক থেকে শুরু করে ক্লাসরুম, গ্রন্থাগারে বই, আবাসিক হল, বাসসহ নানা সংকট রয়েছে। এসব সংকট সত্ত্বেও ছাত্রদের মেধা মননকে কাজে লাগিয়ে সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ঘটানোর জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গৃহীত হচ্ছে বহুমুখী পদক্ষেপ। সত্যের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ানো অপসংস্কৃতির সব বেড়াজাল ছিন্ন করে এবং বিশ্বজনীন আলো ছড়িয়ে দিতে এক ঝাঁক তরুণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর চলছে অবিরাম প্রচেষ্টা।

 

শফিকুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়


এ জাতীয় আরো খবর