শনিবার, এপ্রিল ৪, ২০২০

নিজেকে দরবারের সাধারণ কর্মচারী বলতেন বাদশাহ

  • Abashan
  • ২০২০-০৩-০২ ১১:২৪:১৮
image

১৮৫৭ সাল। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখা দেয় সিপাহি বিদ্রোহের চেহারায়। যার ধারাবাহিকতায় অবসান ঘটে কোম্পানি শাসনের। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ। নিভে যায় মোগলদের শাসনপ্রদীপ। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্নেহধন্য কবি জহির দেহলভির ওই সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থকে ইংরেজিতে ‘দাস্তান-ই-গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনি’ নামে প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউজ ইন্ডিয়া। সিপাহি বিদ্রোহের এ অমূল্য দলিলটিকে বাংলায় প্রকাশের স্বত্ব পেয়েছে বণিক বার্তা। শানজিদ অর্ণবের রূপান্তরে ধারাবাহিক আয়োজন—

 

মওলা বকশ নামের হাতি

মওলা বকশ একটা বুড়ো হাতি। সে বেশ কয়েকজন সম্রাটকে পিঠে চড়িয়েছে। তার স্বভাব ছিল একেবারে মানুষের মতো। পুরো হিন্দুস্তানে সৌন্দর্য, উচ্চতা ও মর্যাদায় তার সমকক্ষ কোনো হাতি ছিল না, অতীতেও না, এখনো নেই। সে যখন বসত, তখনই তার উচ্চতা ছিল অনেক দাঁড়ানো হাতির সমান। সে বারো মাসই মাস্ত থাকত। সে তার মাহুত ছাড়া অন্য কাউকে কাছে আসতে দিত না। সম্রাট মওলা বকশের পিঠে চড়ার সিদ্ধান্ত নিলে আগের দিন একজন চৌবদার গিয়ে তার কাছে সংবাদটি পৌঁছে দিত। সে হাতিটির কানে কানে বলত, ‘মিয়া মওলা বকশ, আগামীকাল তোমাকে কাজে যেতে হবে। দয়া করে গোসল করে প্রস্তুত থেকো।’ হাতিটা তখন তার প্রস্তুতির ইশারা করত। তখন ফিল-বান তাকে খুঁটি থেকে শেকলমুক্ত করে যমুনা নদীতে নিয়ে যেত। সেখানে তাকে ঘষে ঘষে গোসল করানো হতো।

 

এরপর চিত্রকর মওলা বকশের কপালে সুন্দর নকশা এঁকে দিত। ফিল-বান গাদিলা (তার পিঠে বসানো মোটা নরম গদি) বের করে তাকে কারখানায় নিয়ে যেত। সেখানে তার সব অলংকার পরানো হতো, পিঠে আমারি বাঁধা হতো। এটা হাওদার মতো নয়। এরপর মওলা বকশকে নকরখানার প্রবেশদ্বারে আনা হতো। এ সময় মওলা বকশ ট্রাম্পেট বেজে ওঠার মতো শব্দ করত এবং তিনবার সালাম জানাত। এরপর সে নিজ থেকেই বসে পড়ত। সম্রাট ও তার সঙ্গীরা পিঠে চড়ে না বসা অবধি সে বসেই থাকত। সম্রাট ঠিকভাবে বসার পর ফৌজদার ইঙ্গিত করত এবং মওলা বকশ তখন উঠে দাঁড়াত। মওলা বকশের আরো কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল। সম্রাট যখন তার পিঠে চড়তেন, তখন দুটো ধনুক ও দুটি তূণভর্তি খাটো তীর বা বর্শা তার কান থেকে ঝোলানো থাকত। তার কাঁধে বসানো থাকত একটা বিরাট লোহার ঢাল। আর তার মাথার ওপর থাকত রুপার হুক্কা, ছিলিম ও রুপার ঢাকনা। পেছওয়ান সটক বা হুক্কার পাইপ রাখা হতো ফৌজদারের কাঁধে। মওলা বকশের পিঠে চড়ার সময় সম্রাট হুক্কা টানতেন। মওলা বকশ এত নিখুঁতভাবে হাঁটত যে হুক্কা বা ছিলিম নিচে পড়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই ছিল না।

 

মওলা বকশের আচরণের সৌন্দর্যের আরেকটি প্রমাণ দেখা যায় তাকে কাজ থেকে অবসর দেয়ার পর। সম্রাটকে বহন করার কাজ থেকে অবসর পাওয়ার পর মুক্ত মওলা বকশ তেমনই সাবলীল ছিল, যেমনটা সে দায়িত্ব পালনের সময় ছিল। আরেকটা বিশেষ ব্যাপার ছিল যে প্রতিদিনই তার চারপাশে শিশুরা বসে থাকত। সে শিশুদের সঙ্গে খেলত, তাদের আখ খেতে দিত। শিশুরা তার উদ্দেশে বলত: ‘মওলা বকশ! নাক্কি আভে!’  জবাবে সে তার সামনের পা শূন্যে তুলে দোলাত যতক্ষণ না শিশুরা আবার বলে উঠত, ‘টেক দো!’ (নিচে নামাও!)। সে ততক্ষণই পা তুলে রাখত, যতক্ষণ শিশুরা সেটা না নামাতে বলত। এরপর সে চিত্কার করে উঠত এবং শিশুরা এবার এক পায়ে দাঁড়াত। শিশুরা যদি এক মিনিটের আগেই পা নামাতে চাইত, তাহলে মওলা বকশ মাথা নাড়াত। এক মিনিট হয়ে গেলে সে চিত্কার করে শিশুদের পা নামাতে নির্দেশ দিত। শিশুরা যদি কোনোদিন তার সঙ্গে খেলতে না আসত, তাহলে সে উচ্চস্বরে চিত্কার করে তাদের ডাকত। ব্রিটিশরা রাজকীয় হাতিশালা ও আস্তাবলের দখল নেয়ার পর মওলা বকশ ও সম্রাটের ঘোড়া হামদাম খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

 

‘হামদাম’ ছিল অসাধারণ আকর্ষণীয় একটা ঘোড়া। দৌড়ে সে অন্য সব ঘোড়ার চেয়ে এগিয়ে থাকত। সম্রাট সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সে সম্রাটের বাহন ছিল। আমি যে সময়ের কথা বলছি, হামদামের বয়স তখন চল্লিশ। তার সারা শরীর ছোট ছোট লাল গোলাপ দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো ছিল। পশু দুটি খাওয়া বন্ধ করে দেয়ার পর ফিল-বান সন্ডার্সকে বিষয়টি অবহিত করে: ‘সাহেব, হাতিটা খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কাল যদি তার কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে।’ সন্ডার্স ফিল-বানের কথা বিশ্বাস করতে চাইল না। বলল, ‘আমি নিজে গিয়ে তাকে খাওয়াব।’ সন্ডার্স পাঁচ রুপি দামের লাড্ডু ও কাচোরি কিনে সেগুলো মওলা বকশের সামনে দিল। রাগে ও বিরক্তিতে মওলা বকশ মিষ্টির ঝুড়িতে এত জোরে লাথি দিল যে সেটা অনেক দূরে গিয়ে পড়ল এবং মিষ্টিগুলো চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়।

 

সন্ডার্স বিস্ময়ভরা কণ্ঠে চিত্কার করে উঠল, ‘এ হাতি তো বিদ্রোহী! ওকে নিলামে তোলো।’ সেদিনই মওলা বকশকে সদর বাজারে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তার নিলাম শুরু হলো। কিন্তু কোনো ক্রেতা এগিয়ে এল না। শেষমেশ খারি বাওলির এক চোখ কানা এক মুদি দোকানদার বানসি ২৫০ রুপি হাঁক দিল এবং নিলাম শেষ হয়ে গেল। ফিল-বান মওলা বকশকে বলল, ‘আমরা সারা জীবন সম্রাটের সেবায় কাটিয়েছি। আজ নিয়তির বঞ্চনা আমাদের জন্য ভিন্ন কিছু ঠিক করে রেখেছে। এখন আমাদের হলুদ বিক্রি করা একজন মুদির বাড়ি যেতে হবে।’ এ কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে মওলা বকশ দাঁড়ানো অবস্থা থেকে দুম করে মাটিতে পড়ে এবং তখনই মারা যায়।

 

ঠিক একই দিন হামদামও এই দুনিয়া ছেড়ে গেল।

সুবাহানআল্লাহ! কারোর জন্য প্রাণ দেয়া এমন বিশ্বস্ত বন্ধুর দেখা পাওয়ার দৃশ্য সত্যিই কতটা বিরল। এ রকম একটা প্রাণী সভ্য মানুষের চেয়ে হাজার গুণ ভালো। আল্লাহ মানুষের মধ্যেও এমন গুণাবলি দিন।

অনুকরণীয় চরিত্র

হজরত বাদশাহ ছিলেন এমন এক দরবারের সম্রাট, যা ছিল সম্ভ্রমজাগানিয়া রাজসিক গৌরব, আড়ম্বর, মর্যাদা, জাঁকজমকে পূর্ণ। তিনি নিজেও ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত। তার নানামুখী দক্ষতা ছিল, কিন্তু তার পরও তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, নম্র, ধার্মিক ও দয়ালু।

ভদ্রতা ও বিনয় তার রাজকীয় মেজাজে এমনভাবে প্রোথিত ছিল যে তিনি নিজেকে দরবারের একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে অভিহিত করতেন। তিনি এমন একটি শব্দও উচ্চারণ করতেন না, যা রাজকীয় মর্যাদা বা কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করে। অহংকার ও ঔদ্ধত্যের সামান্য একটি বিন্দুও কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি সবার সঙ্গে একই মনোভাব নিয়ে সাক্ষাৎ করতেন। এক্ষেত্রে দর্শনার্থীর উঁচু-নিচু মর্যাদা ভেদ করতেন না।

শাহজাদা থাকা অবস্থায়ই তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। তিনি পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি তারুণ্যের উদ্দামতায়ও তিনি ইন্দ্রিয় ভোগে লিপ্ত হননি; তিনি সবসময়ই ছিলেন ধর্মপ্রাণ।

তিনি এত সুন্দরভাবে কথা বলতেন, মানুষ তার কথা শুনতে চাইত। হাজারো গল্প, কৌতুক, উপাখ্যান ও নানা অদ্ভুত কিচ্ছা-কাহিনী তার জিভের ডগায় ছিল।

তিনি তার প্রয়াত পিতা আকবর শাহ বাহাদুরের সময়ের স্মৃতিচারণ করতেন। তিনি নিজে তখন শাহজাদা ছিলেন।

এটা আমাদের সবার জন্যই একটা সতর্কতা সংকেত—এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া বিশ্বস্ত নয় এবং সময় বিশ্বাসঘাতক, সবাইকে ধোঁকা দেয়। সময়কে বিশ্বাস করা যায় না। এ কারণেই এককালের পুরনো ও পারক্রমশালী সালতানাত আজ এই পতনের কাল প্রত্যক্ষ করছে। এই সাম্রাজ্যের অনেক সম্রাটকে মানুষ সম্ভ্রম দেখাত, যাদের সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি-বিজয় ছিল কিংবদন্তি, যাদের কেতন ছিল কায়সার-ই-রুম (তুরস্কের কায়সার), চীনের খাকান ও রাশিয়ার জারের মাথার ওপর। এরা তাদের তলোয়ারের জোরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তীর্ণ ভূভাগ জয় ও দুনিয়ায় তাদের সাম্রাজ্যের গরিমা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আমির তৈমুরের বিজয় অভিযানগুলো দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত ছিল। তিনি সবচেয়ে বড় বিদ্রোহকে দমন ও তার সব বিরোধীকে খতম করেছেন। বাবরের সাহস দেখুন, নিজের বাড়ি ছেড়ে তিনি কাবুলের সীমান্ত থেকে হিন্দুস্তান পর্যন্ত নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দূরদৃষ্টি ও প্রাজ্ঞতা দিয়ে আকবর বাদশাহ পুরো ভারতের ওপর তার পতাকা উড়িয়েছিলেন। নিজের নামের অর্থের সত্যতা প্রমাণ করে আওরঙ্গজেব আলমগীর ছিলেন দুনিয়া বিজেতা। বায়ান্ন বছর কাপড়ের তাঁবুতে বাস করে তিনি পুরো ভারতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই প্রাচীন সাম্রাজ্য বিশ্বাসঘাতক সময়ের হাতে ধ্বংস হয়েছে। এমনভাবে ধ্বংস হয়েছে, ইতিহাসের পাতায় জায়গা নেয়ার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

 

অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।

(সূরা হাশর: ২)


এ জাতীয় আরো খবর