শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২০

দখলে-দূষণে ন্যাড়া হচ্ছে সিলেটের গ্রিন পার্ক

  • Abashan
  • ২০২০-০২-২৪ ১৬:৫৭:৫২
image

সংরক্ষিত বনভূমির গাছ ও টিলা কেটে গড়ে তোলা হয়েছে পাথর ও কয়লার ডাম্পিং ইয়ার্ড। বনের ভেতরেই স্থাপন করা হয়েছে পাথর ভাঙার কল। এভাবে বৃক্ষনিধন, অব্যাহত দখল আর দূষণে ন্যাড়া হয়ে পড়ছে সিলেটের গোয়াইনঘাটের ‘গ্রিন পার্ক’। বন কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পাথর ও কয়লা রাখার ফলে উর্বরতা হারিয়েছে এই গ্রিন পার্কের মাটি। ফলে দখল উচ্ছেদ করেও বৃক্ষ রোপণ করা যাচ্ছে না। আবার বিভিন্ন গোষ্ঠী ফন্দিফিকির করে বনের জায়গা দখলের পাঁয়তারা করছে।

 

বন বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে গোয়াইনঘাটের তামাবিলে সিলেট-জাফলং সড়কের পাশে বন বিভাগের ৫৩৭ একর টিলা শ্রেণীর ভূমিতে গড়ে তোলা হয় ‘গ্রিন পার্ক’। পার্কের নির্ধারিত জায়গা ছাড়াও সড়কের দুপাশে লাগানো হয়েছিল প্রায় চার লাখ গাছের চারা।

 

এই গ্রিন পার্কের পাশেই তামাবিল স্থলবন্দরের অবস্থান। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পাথর ও কয়লা ভারত থেকে আমদানি হয়। এছাড়া সিলেট-জাফলং সড়ক দিয়ে একটু এগোলেই জাফলং পাথর কোয়ারি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই গ্রিন পার্ককেই ভারত থেকে আমদানীকৃত ও জাফলং থেকে আহরণকৃত পাথরের ডাম্পিং ইয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে কেবল ডাম্পিং ইয়ার্ড নয়, বনের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে পাথর ভাঙার কল। এজন্য কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ ও টিলা। সম্প্রতি মোহাজের নামধারী একটি গোষ্ঠীও নিজেদের দাবি করে পার্কের জমি দখলে নিতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে সংরক্ষিত এই বনের ২৩৭ একর জায়গাই বেদখল হয়ে পড়েছে।

 

সরেজমিনে গ্রিন পার্কে গিয়ে দেখা যায়, পার্কের ভেতরে রয়েছে অন্তত ১০টি পাথর ভাঙার কল ও ২০টি ডাম্পিং ইয়ার্ড। পাথর ব্যবসার জন্য কেটে ফেলা হয়েছে কয়েক হাজার গাছ ও টিলা। ফলে এই সবুজ পার্কের অর্ধেকই এখন গাছপালাহীন ন্যাড়া। পার্কের ভেতরেই চলছে পাথর ভাঙার কাজ। এতে ধুলোয় ধূসর হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। গ্রিন পার্কের ভেতরে পাথর ডাম্পিংয়ের কাজ করছিলেন ইন্তাজ মিয়া নামের এক শ্রমিক। তিনি বলেন, বন বিভাগের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়েই এখানে পাথর রাখা হচ্ছে। তবে কোনো গাছ বা টিলা কাটা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ইন্তাজ মিয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করেই বনের জমিতে পাথর ব্যবসা চলছে।

 

বন দখলের ব্যাপারে জানতে চাইলে তামাবিল কয়লা, পাথর ও চুনাপাথর আমদানিকারক সমিতির সদস্য ইলিয়াছ উদ্দিন লিপু বলেন, শুল্ক স্টেশন থাকাকালে তামাবিলে ডাম্পিং ইয়ার্ড ছিল না। এখন স্থলবন্দরে উন্নীত হওয়ার পর ডাম্পিং ইয়ার্ড করা হলেও তার ভাড়া অনেক বেশি, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। ফলে অনেকে সড়কের পাশে আমদানীকৃত কয়লা রাখেন। তবে বনের জমি দখল ও গাছ কাটার সঙ্গে আমাদের সমিতির কেউ জড়িত নয়।

 

গ্রিন ফরেস্টের জমি দখলে রাখা মোহাজের দাবিদার রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৪৭ সালে সরকার এই জমি আমাদের বরাদ্দ দেয়। পরে বন বিভাগই আমাদের জমি দখল করে গ্রিন পার্ক তৈরি করে। আমরা বরাদ্দকৃত জায়গা পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছি।

 

সূত্র জানায়, পার্ক দখল ও দূষণ করতে নিয়মিত অভিযান চালায় স্থানীয় প্রশাসন। তবে পরে দখলদাররা আবার উদ্ধারকৃত জমি দখল করে নেয়। সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবরে গ্রিন পার্কে বন বিভাগের জমি উদ্ধারে অভিযান চালায় প্রশাসন। অভিযানে ৩৩টি পাথর ভাঙার কলসহ অর্ধশত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় প্রায় ১ হাজার ৮০০ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়। তবে শুধু গ্রিন পার্কই নয়, গোয়াইনঘাট উপজেলায় বন বিভাগের ২২ হাজার ২০৭ একর জায়গার মধ্যে ২০ হাজার ১৭৪ একর জমি বেদখলে রয়েছে।

 

এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিন পার্কে অভিযান চালিয়ে আমরা অবৈধ দখল উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু উচ্ছেদকৃত জমিতেও বৃক্ষ রোপণ করা যাচ্ছে না। কারণ দীর্ঘদিন পাথর ও কয়লা ফেলে রাখার কারণে এ মাটি উর্বরতা হারিয়েছে। এখানকার উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে আরো অনেক সময় লাগবে। পার্কের অনেক জমি বেদখলে থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু জায়গা নিয়ে মামলা চলছে। বাকিদের পর্যায়ক্রমে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হবে।


এ জাতীয় আরো খবর