শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২০

যে কারণে উন্নত দেশে একা থাকার প্রবণতা বাড়ছে

  • Abashan
  • ২০২০-০২-১৬ ১৯:১০:২৪
image

যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে! ছবি আমার বুকে বেঁধে পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে ফিরবে মর” কানন গিরি, সাগর আকাশ বাতাস চিরি’ যেদিন আমায় খুঁজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে!  - কাজী নজরুল ইসলাম।

 

একা করে দেয়ার এমন আদরমাখা হুমকি ধামকি এই যুগে এসে আর আবেদন তৈরি করছে না! একা থাকাই এখন বিশ্বেজুড়ে মানুষের ট্রেন্ড হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে অবিবাহিত বা বিয়ে বিচ্ছেদের পর একা থাকার প্রবণতা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনটাই মার্কিন সেনসাস ব্যুরো তথ্যউপাত্ত এমনটাই ধারণা দিচ্ছে। 

 

তবে একাকীত্ব আর স্বেচ্ছায় একা থাকার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে সময়ে মানুষ একা থাকে মানেই কিন্তু একাকীত্বে ভোগে এমন নয়। উল্টো তারা নিজের মতো জীবন উপভোগ করে। একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষ একাকী আনন্দঘন জীবন যাপন করছে। তাদের সুখের চাবি নিজের হাতেই।  জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এলিয়াকিম কিসলেভের এক গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক একা মানুষ নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারেন। তারা একাকীত্ব অনুভব করেন না। তার কাছে ব্যর্থতা বলে কোনো শব্দ নেই। 

 

কিসলেভের বিশ্বাস, একাকীত্ব যন্ত্রণার উৎসের পরিবর্তে একটি বাড়তি সুবিধা হতে পারে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক পরিসংখ্যানেরতথ্যানুসারে ও কিছু সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে কিসলেভ বলেন, একা থাকা অনেকের জন্য সুখকর। কেননা নিজের পছন্দমতো জীবনযাপনের স্বাধীনতাই এখানে আনন্দ বয়ে আনে। কিসলেভ তার ‘হ্যাপি সিঙ্গেলহুড: অ্যা রাইজিং অ্যাকসেপটেন্স অ্যান্ড সেলিব্রেটিং অব সোলো লিভিং’ বইটিতে বলেছেন, একা থাকা মানেই নিজেকে   হতাশাগ্রস্ত, অন্যের চেয়ে কম যোগ্য বা অবাঞ্ছিত মনে করা নয়। 

 

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও সুইডেনসহ অনেক দেশে একাকী থাকার প্রবণতা বাড়ছে। কিসলেভের বিশ্বাস, একাকীত্বের অনুভূতি জীবনের যে কোনও পর্যায়ে ক্ষমতায়ন এবং আনন্দ অনুভব করার মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত করার নানা  উপায় রয়েছে। কিসলেভের মতে, আপনি যদি একাকীত্বের অনুভূতি থেকে মুক্তি চান তাহলে সেই একাকীত্বের কারণ চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। অব্যাহত একাকীত্বের বোধ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্বের অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

 

আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন অনুসারে, অব্যাহত একাকীত্বে বোধকে নিঃসঙ্গতা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। যা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় এবং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এটি অনিদ্রা এবং হৃদরোগের মতো স্বাস্থ্য সমস্যা, মানসিক পীড়া এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে জানান নিউ জার্সির সেন্টার ফর নেটওয়ার্ক থেরাপিতে মানসিক স্বাস্থ্য এবং আসক্তি চিকিৎসা বিষয়ক মেডিক্যাল ডিরেক্টর ড. ইন্দ্র সিডাম্বি।

 

বিশেষজ্ঞের মতে, সাময়িক একাকীত্ব অবহেলা, অন্যের চেয়ে নিজেকে ছোট মনে হওয়া অথবা কাঙ্ক্ষিত সামাজিক সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে ব্যর্থতার ব্যক্তিগত বোধ থেকে তৈরি হতে পারে। সিডাম্বি বলেন, একা থাকা একজন মানুষকে একাকী করে দেয় না, তবে একা থাকার ব্যাপারে মানুষের ধারণাই তাকে একাকীত্বে অনুভূতি দিতে পার। পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিবাহিত ব্যক্তিরা তাদের পূর্বের জীবনের মতোই নিঃসঙ্গ ও অসুখী হতে পারেন। গবেষকরা বলেন, একাকীত্বের মূলে না গিয়ে অনেকেই কেবল জীবনসঙ্গীর তাগিদ অনুভব করেন। নিঃসঙ্গতা একটি স্বতন্ত্র সমস্যা, যার নিরাময় ব্যক্তির নিজের হাতেই। 

 

মার্কিন সেনসান ব্যুরো এবং ইউরোপীয় সোস্যাল সার্ভের উপাত্তের পাশাপাশি ৩০টিরও বেশি দেশে সম্পর্কের প্রবণতা পরীক্ষা করে কিসলেভ দেখেছেন, সুখী একাকী মানুষ এবং একাকী মানুষের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মনের মতো কাউকে না খুঁজে না পাওয়া, বুড়ো হলে একা হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এমন বেশ কিছু কারণে মানুষ অসুখী। অন্যদিকে সুখীরা তাদের নির্জনতা উপভোগ করেন। ভ্রমণ, নতুন নতুন শখ দিয়ে তারা একাকীত্বকে প্রাণবন্ত করে তোলেন।  এছাড়া একা সুখী মানুষেরা স্বেচ্ছায় অন্তরঙ্গ সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করেন। তারা তাদের পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগে প্রচুর সময় ব্যয় করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিধবা, বিপত্নীক, তালাকপ্রাপ্ত এবং অবিবাহিত ব্যক্তিরা বিবাহিতদের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি সামাজিক। বিবাহিতদের তুলনায় অবিবাহিতদের বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা বেশি। বিয়ের পর মানুষ আগের সম্পর্কগুলো থেকে ক্রমেই দূরে সরে যায়।

 

কিসলেভের গবেষণা আরো দেখা যায়,  কিছু ব্যক্তি তাদের ক্যারিয়ারের লক্ষ্য পূরণে একাকীত্বে নিমগ্ন থাকেন। একা থাকা মানেই বিচ্ছিন্নতা বোধ নয়। এটি পছন্দের বিষয়গুলো অনুসন্ধান, নতুন বন্ধু তৈরি এবং নতুন জায়গা আবিষ্কার করার সুযোগ তৈরি করে।  সোজা কথায়, দম্পতিরা যেমন তাদের বিবাহিত জীবন সুখী করতে শ্রম, সময় ও অধ্যাবসায় বিনিয়োগ করেন। যেমন অনেকে পরামর্শকের কাছে যান, বই পড়েন, সঙ্গীর সঙ্গে  সময় কাটান- তেমনি একাকী জীবন আনন্দময় করতে চাইলেও অবশ্যই বিনিয়োগ করতে হবে।

সিএনএন অবলম্বনে


এ জাতীয় আরো খবর