শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২০

লাভের কাঁকড়া এখন গলার কাঁটা

  • Abashan
  • ২০২০-০২-১২ ১১:৩৭:১৭
image

লাভজনক হওয়ায় মাছ ও চিংড়ি ছেড়ে বাগেরহাটে এক দশকে কাঁকড়া চাষে যুক্ত হয়েছেন হাজারো মত্স্যচাষী। তবে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে চীনে রফতানি বন্ধ থাকায় এখন কাঁকড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। এসব চাষী বলছেন, রফতানিযোগ্য কাঁকড়া আছে খামারে কিন্তু পাঠানোর লোক নেই। স্থানীয় চাহিদাও এত বেশি নয় যে বাজারে বিক্রি করে ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা যাবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পুঁজি হারিয়ে পথে বসতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। পরিস্থিতি সংকটজনক উল্লেখ করে তাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন মত্স্য কর্মকর্তারা।

 

জেলা মত্স্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাগেরহাটের সাত উপজেলায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ৭৭৮টি কাঁকড়ার খামার রয়েছে। গত বছর এসব খামারে ২ হাজার ৩২ টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক উৎস থেকে ৫৯৭ টন কাঁকড়া আহরণ করেছেন জেলেরা। জেলায় উৎপাদিত এসব কাঁকড়ার ৮০ শতাংশ চীনে রফতানি করা হয়েছে।

 

চাষীরা জানান, ১৫ ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কাঁকড়া রফতানির প্রধান মৌসুম ধরা হয়। কিন্তু চীনে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় ২৩ জানুয়ারি থেকে কাঁকড়া রফতানি বন্ধ রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় ডিপো মালিকরা কাঁকড়া কেনা বন্ধ রেখেছেন। ২৩ জানুয়ারির আগে কেনা কাঁকড়াই তারা এখনো বিক্রি করতে পারেননি। এদিকে খামারে আহরণযোগ্য পূর্ণবয়স্ক কাঁকড়া থাকলেও কেউ কিনছেন না। কারণ স্থানীয় বাজারে এসব কাঁকড়ার তেমন চাহিদা নেই।

 

পিনাক মজুমদার নামের রামপাল উপজেলার এক কাঁকড়াচাষী বলেন, চীনের নববর্ষ উপলক্ষে এ সময়ে কাঁকড়ার দাম ও চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তাই আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে কাঁকড়া খামারে মজুদ করেছিলাম। যখন বিক্রির উপযোগী হলো, তখনই চীনে রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। ডিপো মালিক ও ব্যবসায়ীরাও কাঁকড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

 

আব্দুল আজিজ নামের আরেক চাষী বলেন, যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কাঁকড়া বিক্রি করে লাভ তো দূরে থাক, পুঁজি উঠে আসবে না। যে কাঁকড়া কেজিপ্রতি ৫০০ টাকায় কিনে চাষ করা হয়েছে, তা ২০০ টাকার কম দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। ঘেরে থাকা পূর্ণবয়স্ক কাঁকড়া মরতে শুরু করেছে। ১৫ দিনের মধ্যে এসব কাঁকড়া বিক্রি না করতে পারলে সব মরে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। তিনি বলেন, আমরা ব্যাংক, এনজিও এবং স্থানীয়ভাবে ঋণ করে কাঁকড়া চাষ করি। এ অবস্থা থাকলে পুঁজি হারিয়ে পথে বসতে হবে।

 

রামপাল থানা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, চীনে পাঠাব বলে প্রচুর কাঁকড়া ক্রয় করা হয়েছিল। কিন্তু রফতানি বন্ধ হওয়ায় এখন খামারেই কাঁকড়া মারা যাচ্ছে। এভাবে চললে রামপালের চাষী ও ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে যাবে।

 

বাংলাদেশ কাঁকড়া সরবরাহ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অজয় দাস বলেন, চীনসহ কয়েকটি দেশে কাঁকড়া রফতানি হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই রফতানি হয় চীনে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশটিতে কাঁকড়া রফতানি বন্ধ হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছি আমরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে শুধু বাগেরহাট জেলার কাঁকড়াচাষীদের ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে, যা চাষী ও ব্যবসায়ীরা কোনো দিন পুষিয়ে উঠতে পারবেন না।

 

এ ব্যাপারে বাগেরহাট জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক বলেন, বাগেরহাটে উৎপাদিত কাঁকড়া চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও কোরিয়ায় রফতানি হয়। এর মধ্যে চীনেই রফতানি হয় ৮০ শতাংশ। হঠাৎ করে চীনে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চাষী ও ব্যবসায়ীরা যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা চাষীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নতুন বাজার সৃষ্টির বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।


এ জাতীয় আরো খবর