শুক্রবার, জুলাই ১০, ২০২০

প্রাইভেট কারের চাহিদায় পতন, চাঙ্গা এসইউভির

  • Abashan
  • ২০২০-০২-০৭ ১৩:৩২:০৫
image

মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট কারের বাজার। গত তিন বছরে প্রাইভেট কার বিক্রি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। চাহিদা পড়তির দিকে থাকায় আমদানিও কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বিলাসবহুল স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকলের (এসইউভি) ক্ষেত্রে।

 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে প্রাইভেট কারের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে রাইডশেয়ারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি অনেকাংশেই দায়ী। পাশাপাশি ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট, বিভিন্ন অবকাঠামোর নির্মাণকাজের কারণে তৈরি হওয়া বিড়ম্বনাও মানুষকে প্রাইভেট কার কিনতে নিরুৎসাহিত করছে।

 

প্রাইভেট কারের চাহিদা পতনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে গাড়ির নিবন্ধন ও আমদানি তথ্যে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে গত বছর প্রাইভেট কারের নিবন্ধন হয়েছে ১৬ হাজার ৭৮৩টি, যেখানে আগের বছর এর সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ২২৮। এর আগে ২০১৭ সালে নিবন্ধন নিয়েছিল ২১ হাজার ৯৫৯টি প্রাইভেট কার।

 

তথ্যমতে, দেশে বিক্রি হওয়া প্রাইভেট কারের প্রায় ৮০ শতাংশই থাকে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। এসব রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শতভাগই আমদানীকৃত। প্রাইভেট কারের চাহিদা কমায় বর্তমানে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিও কমছে ধারাবাহিকভাবে। বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকল ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা) জানিয়েছে, ২০১৭ সালেও দেশে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছিল ৩২ হাজারের বেশি। সেখান থেকে কমতে কমতে গত বছর তা নেমে এসেছে ১৩ হাজারের কোঠায়।

 

বারভিডার সভাপতি ও হকস বে অটোমোবাইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, তিন বছরের মধ্যে প্রাইভেট কারের আমদানি ৩২ হাজার থেকে ১৩ হাজার ইউনিটে নেমে এসেছে। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চাহিদা কমে যাওয়ার মূল কারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে গাড়ি সরবরাহ করতে না পারা। এক্ষেত্রে সরকারের শুল্ক নীতিমালা বড় ভূমিকা পালন করছে।

 

অন্যদিকে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর যানজট গাড়ির সার্বিক চাহিদা পতনে বড় একটি ভূমিকা রাখছে। তবে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে হলে সমীক্ষা চালানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মিজানুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও আগের তুলনায় বেড়েছে। তার পরও প্রাইভেট কার বিক্রিতে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর একটা বড় কারণ হতে পারে ঢাকার যানজট। গত কয়েক বছরে প্রাইভেট কার বিক্রি কমলেও মোটরসাইকেল বিক্রি অন্তত তিন গুণ বেড়েছে। যানজটপ্রবণ শহরে প্রাইভেট কারের চেয়ে মোটরসাইকেল বেশ দ্রুতগামী। আমার মনে হয়, এ ইস্যুটি প্রাইভেট কারের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

প্রসঙ্গত, দেশে যত প্রাইভেট কার বিক্রি ও নিবন্ধন হয়, তার সিংহভাগই হয় ঢাকায়। গত বছর সারা দেশে নিবন্ধিত সাড়ে ১৬ হাজার প্রাইভেট কারের মধ্যে ১৫ হাজারই ঢাকা মেট্রো থেকে নিবন্ধন নিয়েছে বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।

 

যানজটের পাশাপাশি রাইডশেয়ারের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাও প্রাইভেট কারের চাহিদায় মন্দা ভাবের কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রাইভেট কারে চড়তে হলে এখন আর নিজের গাড়ির দরকার নেই। চাইলেই অ্যাপ ব্যবহার করে নিজের পছন্দমতো গন্তব্যে চলে যাওয়া যাচ্ছে। গাড়ি কেনা, রক্ষণাবেক্ষণ বা ড্রাইভারের ঝামেলাও পোহাতে হচ্ছে না।

 

রাইডশেয়ারের কারণে প্রাইভেট কারের চাহিদা কমতির দিকে—এমন বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত উবার বাংলাদেশের সাবেক প্রধান জুলকার কাজী ইসলাম। তার মতে, এখন কেউ নতুন বা পুরনো গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে একবারের জন্য হলেও রাইডশেয়ারের কথা চিন্তা করছেন। যেখানে রাইডশেয়ার ডাকলে বাড়ির দোরগোড়ায় গাড়ি এসে যাচ্ছে, সেখানে ২০-২৫ লাখ টাকা খরচ করে অনেকেই আর গাড়ি কিনতে চাচ্ছেন না।

 

প্রাইভেট কারের চাহিদায় নিম্নমুখিতা দেখা দিলেও উল্টো চিত্র এসইউভির ক্ষেত্রে। বিআরটিএর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬ সালের আগেও বছরে এসইউভি নিবন্ধন নিত ১৫০ থেকে ৩০০টির মতো। ২০১৬ সালে তা একলাফে উঠে দাঁড়ায় ৬২০টিতে। পরের বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯৩। এরপর ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩৩৯টি ও ২০১৯ সালে ১ হাজার ১৮২টি এসইউভির নিবন্ধন দিয়েছে বিআরটিএ। অন্যদিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিবন্ধন পেয়েছে ১৪৬টি।

 

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত সরকারি পর্যায়ে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এসইউভির বিক্রি বেড়েছে। উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের জন্যও এসব গাড়ির চাহিদা এখন বাড়তির দিকে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরাও এখন এসইউভি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।

 

বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে দক্ষিণ কোরীয় ব্র্যান্ড হুন্দাইয়ের বিভিন্ন মডেলের এসইউভি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। হুন্দাইয়ের পাশাপাশি টয়োটার ল্যান্ড ক্রুজার, প্রাডো, রাশ, হোন্ডার সিআরভি ও এইচআরভি, মিত্সুবিশির আউটল্যান্ডারেরও ভালো চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি ভারতের মাহিন্দ্রার এসইউভিও বাংলাদেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তুলনামূলক উচ্চমূল্যের এসইউভির মধ্যে বিএমডব্লিউ ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা বেশি।

 

একসময় দেশে সবচেয়ে বেশি চলত জাপানি মিত্সুবিশির এসইউভি। মন্ত্রী, আমলা ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা তখন মিত্সুবিশির পাজেরো ব্যাপক হারে ব্যবহার করেছেন। তবে গত দেড় দশকে বাংলাদেশে মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে মিত্সুবিশিকে হটিয়ে শীর্ষে চলে এসেছে আরেক জাপানি মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটা।

 

অন্যদিকে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্তমানে দেশে বিলাসবহুল গাড়ির বাজার একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত মোটরগাড়ি সংযোজন ও বাজারজাতকারী সংস্থা প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। বর্তমানে সংস্থাটি মিত্সুবিশি পাজেরো স্পোর্ট কিউএক্স, এএসএক্স এসইউভি জিপ, ফোর্ডের ল্যান্ডফোর্ট এসইউভি জিপ, মিত্সুবিশির এল২০০ ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাহিন্দ্রার স্কর্পিও ডাবল কেবিন পিকআপের বিভিন্ন যন্ত্র আমদানির পর সংযোজন করে বাজারজাত করছে। সব মিলিয়ে প্রগতি গত অর্থবছর ১ হাজার ৪৭৩টি গাড়ি বিক্রি করেছে, যার সিংহভাগই ছিল বিভিন্ন মডেলের এসইউভি। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের বাইরেও আনোয়ার অটোমোবাইল, নাভানা, এসিআই মোটরসসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি বর্তমানে এসইউভি আমদানি ও বিক্রি করছে।

 

ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণেই এসইউভি উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, দেশে বিক্রি হওয়া সব এসইউভি কিন্তু আমরা একাই উৎপাদন বা সংযোজন করি না। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি ও যন্ত্রাংশ সংযোজন করে এসইউভি বিক্রি করছে। তবে কয়েক বছর ধরে বাজারে এসইউভির ভালো চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। ক্রমবর্ধমান বাজার ধরতে আমাদের কিছু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা আছে। কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও আমরা করছি।


এ জাতীয় আরো খবর