শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২০

তিতুমীর কলেজে ভর্তির আগ্রহ বাড়ছে

  • Abashan
  • ২০২০-০২-০৫ ১২:২৫:০৫
image

মফস্বল শহর ঝিনাইদহ থেকে ঢাকা এসেছে রাকিব। এইসএসসি পরিক্ষা দিয়েই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ভর্তি হবো’ এমন স্বপ্নকে লালিত পালিত করে তার এ শহরে আসা। স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রয়োজন হয় গাইডলাইনের। ভর্তি হয় এক ফার্মগেটের কোচিং-এ। ধূঁমিয়ে পড়াশোনা করে সাপ্তাহিক, মাসিক পরিক্ষাগুলোতে তার (রাকিবের) এসেছে সর্বোচ্চ নাম্বার। দিন যায়, সময় ফুরায়। অপেক্ষায় থাকে কবে হবে ঢাবির ভর্তি পরিক্ষা। তারপর সব বাধা টপিকিয়ে অপেক্ষমান তালিকায় থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া হলোনা আর তার।  স্বপ্নের মোড় ঘুরিয়ে ঢাবির অধিভূক্ত তিতুমীর কলেজকে টার্গেট করে এগিয়েছে পরের পথগুলো। এরপর ঢাবির পরিক্ষার মত করেই ঢাবির সাত কলেজে ভর্তি পরিক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয় রাকিব। ঢাবি না পেলেও পেয়েছে তিতুমীর কলেজ। এইতো অনেকটা স্বপ্ন পূরণ। তিতুমীর কলেজের অরিয়েন্টেশনে গল্পের ছলে রাকিব এসব বলেন।


তুহিনের(ছদ্মনাম) বাড়ি রাজধানীর ভাষানটেকে। স্থানীয় এক বস্তীতে বড় হয়েছে। ছোটবেলায় বাবা মারা যায়। মা লেখাপড়া খাবার জোড়ায় ইসিবি চত্তরের এক মেসে রান্না করে সেটার টাকা দিয়ে। পথশিশুদের দলে যোগ দিয়ে শিখেছে লেখাপড়া। হাঁটি হাঁটি পা করে এসেছে এইসএসসির গন্ডি পেরিয়ে। টাকার অভাবে কোথাও ভর্তি ফর্ম তোলেনি। পরে পাড়ার এক বড়ভাই তাকে সাত কলেজের ভর্তি ফর্ম পূরণ করিয়ে দেয়। তারপর শুরু হয় স্বপ্ন। সবার শেষে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভূক্ত কোনো কলেজে চান্স পাবো কিনা সেটার পুরোটাই অনিশ্চিত। সব কিছু বাদ দিয়ে ক’মাস শুধু পড়েছে, আর পড়েছে। এখন চান্স পেয়েছে তিতুমীর কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে মায়ের কষ্ট ভোলাবে,  বড় চাকরি করবে। ‘শহরের ভালো কলেজে পড়তে অনেক টাকা লাগবে তাই ভেবে ফর্ম তুলিনি। তবে ঢাবির অধিভূক্ত কলেজে খুব অল্প বেতনে ভালো মানের শিক্ষা, ভালো সম্মান। এ আমার জানা ছিলো না।’ -এসব গল্প জানান তুহিন হাস্যজ্বল হয়ে চোখ মুছতে মুছতে।


নীলা আর শীলা দুই বোন। বড় হয়েছে চট্টগ্রামের হালিশহরে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক, মা বুড়িয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে সংসারের কাজ করে টুকিটাকি। বড় বোন শীলার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় ঢাকাতে থাকে। এদিকে শীলা চান্স পায় ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়াতে। বাবা মায়ের একই কথা ঢাকাতে থাকতে হবে সর্বোচ্চ হলেও। কারণ এতো দূর, অচেনা অজানা জায়গা। সেখানে ছোটমেয়ে নীলাকে রেখে ঘুমোতে পারবেনা চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে বাবা-মায়ের। এসব বাধা, প্রতিবন্ধকতার সব হিসেব মেনে নীলা স্বপ্ন বুনে সে ঢাকাতেই থাকবো। একে একে ঢাকাতে অবস্থিত সবগুলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিক্ষা শেয় হয় ; ফলাফল ওয়েটিং লিষ্ট পায়। তবে ভাগ্য সহায় হয়নি। কোথাও  তাকে ডাকেনি। এদিকে সময় থাকলেও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তি পরিক্ষা দিতে যেতে পারছে না। সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারছে না ফর্ম পূরণের। কারণ ওদিকে বাবা আর আপুর কঠোর নির্দেশ ঢাকাতেই থাকতে হবে। চোখেমুখে অন্ধকার আর একগাল মন খারাপ নিয়ে তিতুমীর কলেজে ভর্তি হবার স্বপ্ন দেখে। পড়াশোনা যা করেছিলো তাই দিয়েই পরিক্ষা দিয়ে চান্স পায় তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। এদিকে ঢাবির স্বাদও পেলো, ঢাকার স্বাদও পেলো। অরিয়েন্টেশন ক্লাস শেষে  পুরো মুখে হাসি নিয়ে এসব গল্প করেন নীলা।


এছাড়াও, এবার সাত কলেজে মোট শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে ২১০২৫ জন। তবে এবার সাত কলেজের বিজ্ঞান ইউনিটের মোট ৬ হাজার ৫০০টি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৩৪ হাজার ৯৪ টি। আবেদনকারীর সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় ছাড়িয়েছে বহুগূণে। যা শিক্ষার মান, সাংস্কৃতিক সহ যেকোনো সহশিক্ষার কার্যক্রম বৃদ্ধির ফলে তৈরি হয়েছে। চলতি বছরে ঢাকা কলেজ ১৯ টি ডিপার্টমেন্টে মোট ভর্তি হয়েছে ৩৫১৫ শিক্ষার্থী। সরকারি তিতুমীর কলেজে ২২টি ডিপার্টমেন্টে মোট ভর্তি হয়েছে ৫৬৮০ জন। ইডেন কলেজে ২২টি ডিপার্টমেন্টে মোট ৪৬৮৫ জন। বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ ২০টি ডিপার্টমেন্টে ১৩৯৫ জন। সরকারি বাঙলা কলেজে ১৮টি ডিপার্টমেন্টে ২৩৬০ জন। কবি নজরুল কলেজে ১৭টি ডিপার্টমেন্টে ১৮২০ জন।  সোহরাওয়ার্দী কলেজে ১৭টি ডিপার্টমেন্টে মোট ১৫৭০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে।


তিতুমীর কলেজ বিতর্ক ক্লাবের সভাপতি মাহবুব রিপন জানান, সরকারি তিতুমীর কলেজ -এর  সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রথম সংগঠন সরকারি তিতুমীর কলেজ বিতর্ক ক্লাব -এর সদস্য হওয়ার সুযোগ আবারো উম্মুক্ত হলো।  শুরু হলো,  জিটিসি ডিসি সদস্য সংগ্রহ উৎসব -২০২০।  ক্লাবের সদস্য হওয়ার সুযোগ থাকবে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত। বিজয় বিতর্ক মঞ্চের সামনে থেকে সদস্য ফর্ম সংগ্রহ করা যাবে।


তিনি বলেন, বিজয় বিতর্ক মঞ্চের সামনে সারাবছর যে আড্ডা চলে, শিক্ষার্থীদের পদচারণা শুরু হয় তা শুধু শিক্ষা নিয়ে। প্রত্যেক তিতুমীরিয়ানকে নিয়ে বহুদূর পাড়ি দেবার। নতুনদের নিয়ে আরো ভালো কিছু হোক, হবে। এমনটা আশা রাখি।


ফয়সাল সজিব সদ্য সদ্য ভর্তি হওয়া তিতুমীরিয়ান। কলেজের পরিবেশ কেমন লাগছে এমন প্রশ্নের জবাবে এই শিক্ষার্থী গর্ব নিয়ে বলেন, প্রথমে গেট থেকে ঢুকেই চমকে উঠি। জানি কলেজে ভর্তি হলাম, কলেজের মতই নিরিবিলি, রঙচঙ হীন পরিবেশ হবে। তবে সেটার পুরো ভিন্ন রূপ এখানে। বিভিন্ন সংগঠনের বড় ভাইয়া আপুরা আমাদেরকে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে সকল কাজে সহযোগিতা করেছেন। কলেজে নতুন ভর্তি হয়ে যে ভীতি কাজ করছিলো তা ভালবাসা আর সখ্যতায় রূপ নিয়েছে। এই তিতুমীর কলেজ নিয়ে চার্ট্টি বছর ভালো কাটবে তার এমমনটাই আশা  রাখে বুকে।


আর ফাহমিদার গল্পটা ভিন্ন। ভর্তি কোথায় হবে সে জানতোনা কখনোই। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা নিয়ে ভর্তি হবে দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। বড় হয়ে পুরোটা জুড়ে তার শখ সাংবাদিক হবে, সংবাদ পড়বে। ভাগ্য আর স্বপ্ন সবসময় সবার অনুকূলে থাকেনা। হয়নো নিয়তি চায়নি। তাই তার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়নি। শেষমেশ ভর্তি পরিক্ষার মাধ্যমে অভিভূক্ত কলেজে ভর্তি হলো।


ফাহমিদা তিতুমীর কলেজে অরিয়েন্টেশনে এসে কলেজ সাংবাদিক সমিতি সমন্ধে জানতে পারে। চোখেমুখে হাসি নিয়ে পরিচিত হয়ে নেয় বেশ কয়েকজন ক্যাম্পাস রিপোর্টার দের সাথে। ফাহমিদা সব গল্প শুনেন তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতির মার্জিলা মিলি। তিনি বলেন, কলেজে ভর্তি হয়েও এতো ভালো পরিবেশ পাওয়া ভাগ্যের। তিতুমীর কলেজে সাংবাদিকতা ডিপার্টমেন্ট নেই তবে দক্ষ আর সক্রিয় একটা সাংবাদিক সমিতি আছে। ভর্তি হও, সমিতিতে আসো। সাংবাদিক হতে পারবা, স্বপ্ন পূরণ করতে পারবা। এছাড়াও তিতুমীর কলেজে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নানামুখী সহশিক্ষার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। শিক্ষার্থীদের সতেজ রাখার এই আপ্রাণ চেষ্টাপ্রচেষ্টা সফল হবে এমনটাই প্রত্যাশা সকল সংগঠকদের।


এ জাতীয় আরো খবর