শুক্রবার, জুলাই ১০, ২০২০

ইবোলা ও করোনা ভাইরাসের ইতিহাস

  • Abashan
  • ২০২০-০২-০৪ ২৩:১১:৩২
image

আফ্রিকা—নাম শুনলে আমাদের চোখে অনেক ধরনের ছবি ভেসে ওঠে। কারো চোখে আফ্রিকা মানে গভীর জঙ্গল কারো চোখে সেটা কৃষ্ণাঙ্গদের আবাসস্থল কারো কাছে অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়। আফ্রিকার এমনই একটি দরিদ্র্যপীড়িত দেশ গিনি, ২০১৩ সালে যেখান থেকে ছড়াতে শুরু করে ইবোলা ভাইরাস। যেটি পরে হাজারও মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।

 

ইবোলা ভাইরাস
আফ্রিকার অধিকাংশ স্থানেই নিরাপদ খাবার পানির অভাব রয়েছে। একটু ভালো পানির জন্য পাড়ি দিতে হয় মাইলের পর মাইল পথ। সুপেয় পানির অভাবে নোংরা পানি দিয়েই হাত-মুখ ধোয়া ও বাচ্চাদের পরিচর্যার কাজ সারা হয়। আর যদি এই পানিও না পাওয়া যায় তাহলে মায়েরা তাদের হাতে একটু থুথু নিয়ে বাচ্চাদের ময়লা পরিষ্কার করে।


গিনির মালিয়ান্দু গ্রামেও ছিল পানির অভাব। সেখানে সিয়া নামে এক নারী তার পরিবার নিয়ে থাকত। একদিন কাপড় ধোয়ার জন্য দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে কাছেই মাকোনা নামক জায়গায় যান যেখানে গ্রামের বেশিরভাগ নারীই কাপড় ধুতে আসে। তাদের সাথে আসা বাচ্চারা জলাশয়ের পাশেই খেলাধুলা করে।

 

সেখানে ছিল একটি দীর্ঘকায় গাছ; যার মাঝখানটা ফাঁপা। সেই ফাঁপা অংশে উড়ন্ত ইঁদুর বলে একধরনের বাঁদুড় বসবাস করে। এদের গা থেকে উৎকট গন্ধ বের হয়। বাচ্চারা অভিনব কৌশল ব্যবহার করে বাঁদুড়গুলো ধরে। তারা গাছের ফাঁপা অংশে ধোঁয়া ছড়িয়ে দেয়, এতে বাঁদুড়গুলোকে বের হয়ে আসে। তারপরই ক্ষুদে শিকারীদের শিকারে পরিণত হওয়া এদের নিয়তি। বাচ্চারা এই বাঁদুড় আগুনে পুড়িয়ে খায়। এমনকি বাঁদুড়ের গায়ে লেগে থাকা ছোটখাটো পোকাও তারা খেয়ে ফেলে।

 

সিয়ার ছেলেও সেদিন একই কায়দায় বাঁদুড় শিকার করতে গিয়ে ঘটিয়ে ফেলে খানিক বিপত্তি। সেই বিপত্তির পেছনে থাকতে পারে বেশকিছু কারণ। ১. হয়তো বাঁদুড় ধরতে গিয়ে ছেলেটির চোখে এসে পড়ে বাঁদুড়ের গায়ের রক্ত কিংবা প্রস্রাবের ছিটা, ২. কিংবা হয়তো তাড়াহুড়ো করে মাংস পোড়াতে গিয়ে সেটি আধাকাঁচা থেকে যায়, ৩. অথবা যে ছোটখাটো পোকা থাকে বাঁদুড়ের গায়ে, তার কোনো একটি কামড় দিয়ে থাকতে পারে ছেলেটিকে।

 


বাসায় ফেরার পরে সিয়ার ছেলে অসুস্থ হয়ে যায়। ২৪ ডিসেম্বর ডায়ারিয়া শুরু হয় এবং দুই দিনের মধ্যেই পায়খানার রঙ কালো হয়ে যায়। ক্রমে নিস্তেজ হয়ে আসে বাচ্চাটির ছোট্ট শরীর, ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু তা হলো না। ছেলের মৃত্যুর অল্প কিছুদিনের মধ্যে মারা গেল সিয়া। হালকা জ্বর ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

 

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এই পরিবারে শুরু হলো মৃত্যুর মিছিল। সিয়ার পর মারা গেল তাদের সেবা-যত্নে নিয়োজিত থাকা সিয়ার মা। পরিবারে তাদের দেখভাল করার যখন আর কেউ নেই তখন বাইরের একজন মহিলা এসে সেবার কাজ শুরু করেন। নিয়তির মারপ্যাচে তিনিও হয়ে গেলেন অসুস্থ। এতদিনে সারা গ্রামে এটা একটা আতঙ্কজনক ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই তাকে নিয়ে যাওয়া হলো প্রায় সাত মাইল দূরের একটি হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি হবার কিছুদিন পর মারা গেলেন সেই মহিলাও। এরপর আক্রান্ত হলেন তাকে সেবা দিতে আসা নার্স। তাকে নিয়ে যাওয়া হল আরো দূরে, আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য। চল্লিশ মাইল দূরের একটি হাসপাতালে মারা যান সেই নার্সও। ততদিনে ইবোলার ভাইরাস তার লক্ষ্যে সফল। ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গিনিতে। কেড়ে নিচ্ছে একে একে তাজা প্রাণ।

 

২০১৩ সালের এমন ম্যাসিভ এটাকের আগেও ইবোলা হানা দিয়েছিল আফ্রিকায়। ইবোলা প্রথম শনাক্ত হয় সুদানে, ১৯৭৬ সালে। এই সময় কংগোর ইবোলা নদীর ধার ঘেঁষে গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাসটি। সেই নদীর নামানুসারেই ভাইরাসটির নামকরণ করা হয়। ২০১৩-তে আফ্রিকায় যে ইবোলা দেখা যায় তা ছিল ২১তম বারের মতো। এর আগে আরো ২০ বার দেখা গেছে এই ভাইরাসকে। এ কারণেই হয়তো ইবোলা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না কেউ। ১৯৭৬ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত যে ২০ বার ইবোলার আক্রমণ হয়েছে, কোনোবারই সেখানে ২৮০’র বেশি মানুষ মারা যায়নি। ২০টি আক্রমণের ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ১৬০০’রও কম।

 

কিন্তু কে জানত অবহেলা করে ফেলে রাখা এই ইবোলাই একটা সময় প্রাণ কেড়ে নেবে প্রায় ১১,০০০ মানুষের? কে ভেবেছিল আক্রান্ত হবে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ? যে ইবোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হলো না সেই ইবোলার জন্য জারি করতে হলো রেড এলার্ট, তাও বিশ্বব্যাপী! এমনি ভয়াবহ এবং মরণঘাতি হয়ে ধীর পায়ে ছড়িয়ে পড়ে ইবোলার ভাইরাস।

 

করোনা ভাইরাস
গবেষকরা পৃথিবীর ব্যাপারে দুটো কথা বলে থাকেন। এক, যদি তৃতীয় বিশযুদ্ধ হয় তবে সেটা হবে পানি নিয়ে এবং দুই, যদি পৃথিবী ধ্বংস হয় তবে সেটা হবে ভাইরাসের কারণে। গেল বছরের ইবোলা ভাইরাসের ভয়াবহতা আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। সেই দগদগে ক্ষতের মধ্যে এবার এসেছে আরেক ভাইরাস—করোনা। যেহেতু এবার এনিয়ে খুব মাতামাতি হচ্ছে, তাই অনেকের ধারণা এটি হয়তো সম্পূর্ণ নতুন কোনো ভাইরাস। যদিও মোটেও তা নয়, বরং ১৯৬০ সালে প্রথমবার সাপ থেকে করোনা ভাইরাসের আবিষ্কার হয়। এটি একটি SARS গ্রুপের ভাইরাস। প্রথম ২০০৩ সালে মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়। যা human coronavirus 229E নামে পরিচিত। পরিবর্তিতে ২০০৪, ২০০৫ এবং ২০১২ সালে জেনেরিক মোডিফিকেশন ঘটে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে WHO নোভেল করোনা ভাইরাস আবিষ্কার করেন। যা n-COV নামে পরিচিত। এর উপসর্গগুলো হচ্ছে জ্বর, অবসাদ, শুকনো কাশি, নিউমোনিয়া, কিডনি ফেইলিউর এবং সর্বশেষ মৃত্যু।

 

এই ভাইরাসটির সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় এটি মানুষের সংস্পর্শে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটির উৎপত্তিস্থল হুবাই প্রদেশের উহান শহরের সী ফুড মার্কেট। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে উহান শহরে সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা বলা হচ্ছে। শহরটির একটি বাজারে গিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই বাজারটিতে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হতো। কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনা ভাইরাস বহন করতে পারে। তবে উহানের ওই বাজারে মুরগি, বাঁদুড়, খরগোশ এবং সাপ বিক্রি হতো। তাই মূলত এই গোত্রীয় প্রাণীবাহিত হয়ে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

 

তবে আশার কথা হলো এই ভাইরাসকে শুরু থেকেই খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটার উৎপত্তি হয়েছিল যেখানে অর্থাৎ উহান প্রদেশকে পুরোপুরি লকড করে রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে কেউ সেখানে যেতে পারছেন না। ভেতরের কেউ পারছেন না বাইরে আসতে।

 

ইতোমধ্যে আমেরিকা এবং ব্রিটেনের দুটি বিশেষায়িত টিম এর প্রতিষেধক বের করার চেষ্টা করছে। থেমে নেই চীনের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও। তারাও এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের একটি মহল দাবি করছে তারা কিছু প্রাথমিক সফলতাও পেয়েছেন।


এ জাতীয় আরো খবর