মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০২০

এক্সপেডিশন ইউফ্রেটিস ১৮৩৬

  • Abashan
  • ২০২০-০২-০১ ১০:২৫:০৯
image

বেশ ক’বছর আগে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর বসরায় একটি বড় মার্বেলের ভাঙা টুকরো পাওয়া যায়, তাতে ইউফ্রেটিস অভিযানে নিহত ২১ জনকে স্মরণ করা হয়েছে, তারিখ ২১ মে ১৮৩৬, আনা থেকে ৮৫ মাইল উজানে ইসজার্লসের কাছে ঘটনাটি ঘটে।

 

ইংরেজের শিল্প-কারখানা এবং ভারতের কাঁচামালের মধ্যে দ্রুততম সংযোজক ও বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছিল ইউফ্রেটিস অভিযান। মধ্যপ্রাচ্যের ভেতর দিয়ে ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যে সংযোজক পথেই তা সম্ভব—কারো কারো মত ছিল এটাই। অন্যরা বললেন, আলেকজান্দ্রিয়া থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত সড়কপথেই যেতে হবে, এছাড়া গতি নেই। কিন্তু ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস রাউডন চেসনির কাছে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রুট হচ্ছে ইউফ্রেটিসের পথ ধরে এগোনো। তাতেই সবচেয়ে সহজে ভারতে পৌঁছানো যাবে। 

 

ক্যাপ্টেন চেসনি ইংরেজ সন্তান, তার বাবা ১৭৭২ সালে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় অভিবাসী হয়ে গমন করেন। কিন্তু আমেরিকান বিপ্লব চলাকালে তিনি ব্রিটিশদের পক্ষে লড়াই করলে জর্জ ওয়াশিংটনের হাতে বন্দি হন এবং ছাড়া পেয়ে একেবারে কপর্দকহীন অবস্থায় আয়ারল্যান্ডে ফিরে আসেন। সেখানে ১৬ মার্চ ১৭৮৫ চেসনির জন্ম হয়। সৌভাগ্যবশত লর্ড কর্নওয়ালিশ তার বাবার আনুগত্যের কথা স্মরণ করে তাকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রদান করলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তরুণ চেসনি অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র এবং দক্ষ সৈনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৮২৫ সালে তাকেই মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য নতুন রুট আবিষ্কারের জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

 

চেসনি প্রথমে মিসর পৌঁছলেন। তারপর ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী ৮০ মাইল দীর্ঘ এলাকা অনুসন্ধান করলেন। তার দলের প্রকৌশলীরা ভয় পাচ্ছিলেন লোহিত সাগরের স্রোত যদি তাদের ভূমধ্যসাগরে ছুড়ে ফেলে!

 

কিন্তু চেসনি থেমে থাকেননি। ১৮৩১ সালে সড়কপথে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত পৌঁছে উপত্যকার পথ ধরে ভেলায় চেপে আরো গভীরে পৌঁছলেন, যেখানে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের স্রোতধারা মিশেছে। এ স্রোত গিয়ে পারস্য উপসাগরে পড়েছে। চেসনি বুঝে গেলেন ভারতে যাওয়ার এটাই সহজতম রুট। শর্টকাটে ভারত পৌঁছাতে হলে ইউফ্রেটিস নদীপথকে ব্যবহার করাই হবে যুক্তিযুক্ত। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রস্তাব রাখলেন এ রুটটিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালনার জন্য বাষ্পীয় জাহাজ পরিচালনা করতে হবে এবং এ পথে প্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে কিনা, তাও এতে বোঝা যাবে।

 


তার প্রস্তাব রাজা চতুর্থ উইলিয়ামের কাছে আকর্ষণীয় মনে হলো। তিনি তাকে বিশেষ সমর্থন জোগাতে সম্মত হলেন, তবে তাকে আরো কতগুলো বিষয় পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাবনা যাচাই করার দায়িত্ব দিলেন:

ক. সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্যিক জরিপ,

খ. টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস অববাহিকা জরিপ,

গ ভারতের সঙ্গে রেলওয়ে ও স্টিমার যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই

ঘ. বাজার যাচাই এবং ব্রিটিশ বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই

 

এক্সপেডিশন ইউফ্রেটিসের প্রথম কাজটাই চেসনিকে ভীষণ চ্যালেঞ্জের মধ্যে ঠেলে দিল। স্টিমবোট বা বাষ্পীয় জাহাজ তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্য আনা, তারপর সড়কপথে এ জাহাজ ইউফ্রেটিস নদীতে পৌঁছানো। তারা ১০৩ ফুট ও ৭০ ফুট দীর্ঘ দুটো স্টিমারের কথা ভাবলেন—প্রায় ১৪০ মাইল পার্বত্য, মরুপথ ও জলাভূমি অতিক্রম করিয়ে নদীতে টেনে আনতে হবে।

 

প্রস্তুতি নেয়ার পর ১৮৩৫-এর বসন্তে অরন্তেস নদীর মোহনা থেকে ইউফ্রেটিস অভিযাত্রা শুরুর আগে ভেঙে ফেলা জাহাজ টাইগ্রিস নতুন করে বাধা হলো। ইউফ্রেটিসের মতো খরস্রোতা নদীর জন্য জাহাজটাকে ছোটই বলতে হবে। জাহাজের মাস্তুল থেকে শুরু করে মালপত্র ও কয়লা পরিবহনের জন্য ২৭টি ওয়াগনও তৈরি করতে হলো। পাহাড় কেটে জাহাজ ঠেলে নেয়ার মতো ‘হারকুলিয়ান’ কাজ তাদের সামনে। এ উদ্ভট পরিকল্পনার কথা শুনে শ্রমিকদের কেউ কেউ পালিয়েও গেলেন। রাজনৈতিক বাধাও এল। মিসরের শাসক মুহাম্মদ আলী তখন সিরিয়াও শাসন করতেন। ইউফ্রেটিস নদীপথে ভারতে যাওয়ার ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করে চেসনিকে প্রতিরোধও করলেন। মুহাম্মদ আলী যথার্থই অনুধাবন করেছেন, যদি ইউরোপের সঙ্গে ভারতের নৌপথ খুলে যায়, তাহলে মিসরের ওপর দিয়ে পরিকল্পিত সড়কের গুরুত্ব কমে যাবে। তিনি ব্রিটিশ অভিযানের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলা বন্ধ করে জাহাজ নির্মাণ উপাদান দুর্লভ করে তুললেন, শ্রমিকরা পালিয়ে গেলেন, বোঝা টানা প্রাণীগুলো ভিন্ন কাজে লাগিয়ে দেয়া হলো।

 

চেসনি নিরুত্সাহিত হওয়ার লোক নন। তিনি কায়রো ও ইস্তাম্বুলে কর্মরত ব্রিটিশ রাজদূতদের কাজে লাগিয়ে অটোমান সুলতানকে ক্ষেপিয়ে তুলে মিসরের শাসককে কিছুটা দমন করালেন। টাইগ্রিসের সঙ্গে সঙ্গে বড় জাহাজ ইউফ্রেটিসের নির্মাণকাজ শেষ করা হলো। অজস্র শ্রমিক এবং ১০০ ষাঁড় দিয়ে টেনে ১৮৩৬ সালের ১৭ মার্চ ইউফ্রেটিস জাহাজটিকে নদীতে ভাসানো হলো। বেদুইন ও গ্রামবাসী পরিবেষ্টিত অবস্থায় ২১ বার অটোমান সুলতানের নামে তোপধ্বনি দিয়ে ব্রিটিশ ও তুর্কি পতাকা উড়িয়ে প্রবল করতালির মধ্যে জাহাজ দুটোতে সিটি বাজল।

 

ইউফ্রেটিস জাহাজে আছেন ২২ কর্মকর্তা ও বৈজ্ঞানিক, ১৩ জন আরব নাবিক, একজন কালো বাবুর্চি এবং একজন ইরাকি দোভাষী। জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ডক্টর ইউহান হিফার এবং তার স্ত্রীও এ জাহাজে উঠলেন। টাইগ্রিস জাহাজে ছিল ২০ জন কর্মকর্তা ও বৈজ্ঞানিক এবং ১২ জন আরবীয় নাবিক।

 

ইউফ্রেটিসের পানির ওপর ভরসা রাখা যায় না। ঝড়ঝঞ্ঝায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পানি, অঘটন ঘটিয়ে দেয়। অভিযানের পথ বিরেসেন বন্দর থেকে পারস্য উপসাগরের কাছে বসরা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মাইল। কিন্তু চেসনি যখন দেখলেন পুরো ৩৪ দিন পার হওয়ার পর মাত্র ১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন, তিনি বিচলিত হলেন। এভাবে চলতে থাকলে অভিযান শেষ করতেই বছর পেরিয়ে যাবে। ওদিকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হিফার বিচিত্র বৃক্ষ ও পাখির বিবরণী লিখে রাখছেন। শ্লথগতিতে তার কাজের সুবিধা বেশি। প্রতিকূলতা সর্বত্র। এ পথে আগে কখনো জাহাজ চলেনি। যাযাবর সম্প্রদায়ের লোকজন তীর ধনুক নিয়ে আক্রমণের অপেক্ষায় আছে। চেসনি স্মরণ করলেন রাজা উইলিয়ামের কথা। তিনি তাকে বলেছিলেন: মনে রাখবেন ব্রিটেনের সাফল্য নির্ভর করছে বাণিজ্যের সাফল্যের ওপর। বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্যই মূলত তিনি এ চ্যালেঞ্জিং অভিযাত্রাকে সমর্থন দিয়েছেন।

 

এপ্রিলে ডুবন্ত পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে একটি ওয়াগন ডুবে গেলে ১৫ টন কয়লা নদীতে তলিয়ে যায়। পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে অভিযানের সমাপ্তি টানতে হবে। ২১ মে ঠিক বেলা ১টা ২০ মিনিটে দেখা গেল উত্তর-পশ্চিম আকাশ ভয়ংকর কালো হয়ে উঠেছে, বাতাসের ঘূর্ণি শুরু হয়ে গেছে। ঝড় আসন্ন। চেসনি ভাবছেন, এমনিতে অভিযানে পিছিয়ে পড়েছেন, কাল অবশ্যই ১৩০ মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে। আকাশের ঘন কালো রঙের কথা লিখেছেন বিজ্ঞানী হিফার। এমনটি তিনি জীবনেও দেখেননি। আসলে তখন ভয়াভয় হারিকেনের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে।

 

চেসনি আদেশ দিলেন, দ্রুত জাহাজ দুটোকে তীরে নিয়ে নোঙর ফেলে বেঁধে রাখতে হবে। কিন্তু ততক্ষণ হারিকেন টাইগ্রিস জাহাজকে আছড়ে ফেলেছে তীরে, ঘূর্ণি আবার টেনে এনেছে নদীতে। সবার চোখের সামনে টাইগ্রিস ডুবে গেল। ঝড়ের তাণ্ডবে সে জাহাজের কারো চিত্কারও কানে পৌঁছল না। টাইগ্রিসের ক্যাপ্টেন ও আরো ২০ জনের মৃত্যু হলো সেখানে, প্রবল স্রোত মরদেহগুলো নিয়ে গেল আরো গভীর জলরাশিতে। ডক্টর হিফার ও ক’জন অফিসার ঝড়ের মধ্যেই তীরে লাফিয়ে পড়েছিলেন, তারা বেঁচে গেছেন। তারাই ক্যাপ্টেন চেসনিকে জীবিত খুঁজে পেলেন একটি মাঠে, হারিকেন ও জলস্রোত তাকে এখানে ঠেলে এনেছে। টাইগ্রিসের আর খবর পাওয়া যায়নি। জাহাজের লম্বা চোঙ্গাটি ডুবতে দেখেছেন হিফার।

 

এক্সপেডিশন ইডফ্রেটিসের সমাপ্তি সেখানেই। ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দেয়। দুর্ঘটনা, সহ-অভিযাত্রীদের মৃত্যু ও তহবিল সংকট—চেসনি পুনরায় অভিযানের উদ্যোগ আর নিতে পারেননি। অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও ইউফ্রেটিস জাহাজ যাত্রা অব্যাহত রাখে এবং ১৮ জুন বসরা বন্দরে পৌঁছে। ব্রিটিশ সরকার ও ভারত সরকার উভয়েই ব্যর্থতার জন্য চেসনিকে গালমন্দ করে, তবে বহু বছর পর রয়াল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি পশ্চিম এশিয়ার ভৌগোলিক জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের জন্য তাকে একটি স্বর্ণপদক প্রদান করে। এটিই তার একমাত্র সান্ত্বনা।

 

টাইগ্রিস জাহাজের নিহত সেই ২১ জনের স্মরণে যে প্রস্তরলিপি লেখা হয়েছিল, বসরায় আবিষ্কৃত হয়েছিল তারই একটি খণ্ড।

দুর্ঘটনার তারিখটি ২১ মে ১৮৩৬।

[মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেন জন ব্রিনটন, তাকে অনুসরণ করেই সংক্ষেপে লিখিত হয়েছে ‘এক্সপেডিশন ইউফ্রেটিস ১৮৩৬’]

 

ইবনে মোতালিব: লেখক


এ জাতীয় আরো খবর