শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২০

ফোরাতের পথ ধরে

  • Abashan
  • ২০২০-০২-০১ ১০:১২:৩০
image

ইউফ্রেটিস বা ফোরাত শুধু এক নদীর নাম নয়, বরং ইতিহাস, পুরাণ আর স্বপ্নে ঘেরা এক সত্তা। ইউফ্রেটিস আর টাইগ্রিসের তীরেই বাইবেলে বর্ণিত গার্ডেন অব ইডেনের অবস্থান। ভারতের জন্য যা গঙ্গা সভ্যতার দোলনা, মেসোপটেমিয়ার জন্য ইউফ্রেটিসও তাই। কাল আর ইতিহাসের সাক্ষী ফোরাতের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৭৬০ কিলোমিটার। ইউফ্রেটিস তৈরি হয়েছে দুটো নদীর মিলনে। প্রথমটি কারা সু, যার উদ্ভব তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে, অন্যটি মুরাত সু, যা এসেছে আরারাত পর্বত থেকে। ইউফ্রেটিস তুরস্কের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে এক হাজার কিলোমিটার। এরপর প্রবেশ করেছে সিরিয়ায় এবং শেষমেশ ইরাকে। বসরার শাত আল-আরবে এসে ইউফ্রেটিস যুক্ত হয়েছে টাইগ্রিস বা দজলা নদীর সঙ্গে এবং এখান থেকে টাইগ্রিস গিয়ে মিশেছে পারস্য উপসাগরে। এ অঞ্চলে ইউফ্রেটিস একটি সীমান্ত অঞ্চল। একসময় এ নদী পারসিক সাম্রাজ্যকে পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ভাগ করেছিল। ‘ইউফ্রেটিস পেরিয়ে’ এ অঞ্চলের একটি প্রচীন কথা। একসময় এ নদী পরিচিত ছিল রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্ত হিসেবে।

 

প্রাচীন পারস্যের মানুষ এ নদীকে ডাকত উফরাতু নামে। বারো শতকের ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ মুজাম আল বুলদানে ইউফ্রেটিস নদীর বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। ইউফ্রেটিস নামটি নিয়েও তিনি তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, মূল শব্দটি হচ্ছে ফালাদ্রুদ এবং আরবি ভাষায় আল ফুরাত। ফালাদ্রুদ শব্দটি এসেছে ফালাদ থেকে, ফার্সি ভাষায় যার অর্থ ‘এর পারে’। হামাবি এর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন: ‘ইউফ্রেটিস নদীর অবস্থান টাইগ্রিসের পরেই। টাইগ্রিস আবার ইরানের পরে অবস্থিত। তাই এর নাম ফালাদ্রুদ, যা ফালাদ থেকে এসেছে (ইউফ্রেটিস নদীর কাছে)।’ এ বিবৃতির পর হামাবি একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

 

মধ্যযুগে আরব ভূগোলবিদরা ইউফ্রেটিসকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। আরব ভূগোলবিদ হিমায়ারি ইউফ্রেটিস নদীকে বর্ণনা করেছেন এবং পৃথিবীর ছয়টি মূল নদীর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ইউফ্রেটিস দুনিয়ার দীর্ঘ নদ-নদীগুলোর একটি। অন্যগুলো হলো নীল নদ, গঙ্গা, আমু দরিয়া, টাইগ্রিস ও চীনের পার্ল রিভার। আরেক ভূগোলবিদ এল জুহরি ইউফ্রেটিসকে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী বলে বিবেচনা করেছেন এবং তার মতে, এটিই দুনিয়ার দীর্ঘতম নদী।

 

মধ্যযুগের প্রায় সব ভূগোলবিদই ইউফ্রেটিস বেসিন নিয়ে একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন। সবখানেই নদীর উত্স ও সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। সাহিপ হুদুদ-ই আলেম উল্লেখ করেছেন, ইউফ্রেটিস নদীর উত্স হলো আলিক পর্বত এবং এ নদী আনাতোলিয়াকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। তার বর্ণনায় ইউফ্রেটিসের তিনটি শাখার কথা জানা যায়—হাবুর, ইসা ও সারসার নদী।

 

প্রাচীনকাল থেকেই ইউফ্রেটিসের স্রোত অত্যন্ত প্রবল। আর তাই নৌ-পরিবহনের জন্য এ নদী ছিল দারুণ উপযোগী। মধ্যযুগে সামসাত ছিল একটি দুর্গনগরী এবং এখানে বন্দরও ছিল। এ শহর থেকে বাগদাদের মধ্যে ইউফ্রেটিস নদীর মাধ্যমে নিয়মিত পরিবহন জলপথ ছিল। দামাস্কাস ও বাগদাদের মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগও ছিল ইউফ্রেটিসের মাধ্যমে। এ নদী দিয়ে প্রচুর মালপত্র পরিবাহিত হতো। পরিবাহিত মালপত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল কাঠের গুঁড়ি। এগুলো আসত পূর্বাঞ্চলীয় আনাতোলিয়া পর্বত থেকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ছিল দামাস্কাসের অলিভ অয়েল। ইউফ্রেটিস অববাহিকাসমৃদ্ধ কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এ নদীকে নির্ভর করে। একই সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকেই এ নদী ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। মধ্যযুগের সিল্ক বাণিজ্যের পথ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব ছিল ইউফ্রেটিস নদীর। আব্বাসীয় শাসনামলে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম দুটি পথ ছিল টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস।

 

দশম শতাব্দীতে এক ইসলামী ভূগোলবিদ ইউফ্রেটিসকে বলতেন পারস্য উপসাগরের চীন সাগর। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস উভয়ই পারস্য উপসাগরে এসে মিশেছে এবং এটাই ছিল দূর পুবে যাওয়া জাহাজের জন্য যাত্রা বিন্দু। ভুবনবিখ্যাত বসরা নগরী গড়ে উঠেছে ইউফ্রেটিসের কারণেই। এখান থেকে পুবগামী আরব জাহাজগুলো যাত্রা করত। 

 

আরব ভূগোলবিদ্যায় ইউফ্রেটিস কেবল নদী হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং অনেক ভূগোলবিদ এ নদীকে পবিত্রতার কাঠামোতেও যুক্ত করেছেন। কাজাবিনি ও ইদরিসি বলেছেন, চারটি নদীর আগমন ঘটেছে স্বর্গ থেকে, আর এ চার নদী হচ্ছে—নীল, সির দরিয়া, আমু দরিয়া ও ইউফ্রেটিস। তবে ইবনে বতুতা জানিয়েছেন একটু ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেছেন, কথিত আছে স্বর্গে উদ্ভব ঘটেছিল চারটি নদীর, কিন্তু তার মধ্যে দুটি নদীর প্রবাহই আসমান থেকে জমিনে এসেছে এবং সে দুটি নদী হচ্ছে নীল নদ ও ইউফ্রেটিস।

 

ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের তীরে গড়ে উঠেছিল দুনিয়ার প্রথম সভ্যতাগুলোর অন্যতম মেসোপটেমিয়া। এ অঞ্চল সভ্যতার দোলনা নামে পরিচিত। আরবরা এ অঞ্চলকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে। মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ ভাগ তাদের জন্য সেভাদ বা ইরাক আর উত্তরাংশ আল জাজিরা। আরব ভূগোলবিদ আল জাজিরা উল্লেখ করেছেন, আল জাজিরার অবস্থান ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের মাঝে।

 

মধ্যযুগে সিরিয়া ও ইরাকের জন্য ইউফ্রেটিস ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। পারস্য উপসাগর থেকে মালপত্র ইউফ্রেটিসের তীর ধরে ক্যারাভানে কিংবা নদীপথে বিভিন্ন নগরে পৌঁছত। এ পথে দুটো গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল রাক্কা ও বালিস।

 

শুধু বাণিজ্য জাহাজ নয়, ইউফ্রেটিসের প্রবাহে বয়ে চলেছে কত সাম্রাজ্যের ইতিহাস, পুরাণ। দূর অতীতে ইউফ্রেটিসের তীরে গড়ে ওঠা উরুক নগরের শাসক ছিলেন গিলগামেশ, সেটা যিশুর জন্মেরও আড়াই হাজার বছর আগের কথা। উরুক শহরের নাম থেকেই ইরাক নামটির উদ্ভব। গিলগামেশের জীবন নিয়ে রচিত গিলগামেশ মহাকাব্য ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো গ্রন্থ বলে বিবেচিত।

 

২০০৩ সালে ইরাকে কর্মরত একদল প্রত্নতাত্ত্বিক দাবি করেন যে তারা খুব সম্ভবত রাজা গিলগামেশের সমাধি খুঁজে পেয়েছেন। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিকরা। তাদের দাবি ছিল, তারা পুরো উরুক নগরটিই খুঁজে পেয়েছেন। একসময় এখানে ইউফ্রেটিসের প্রবাহ ছিল। আর এখানেই সমাহিত হয়েছিলেন গিলগামেশ। মিউনিখের ব্যাভারিয়ান ডিপার্টমেন্ট অব হিস্টোরিক্যাল মনুমেন্টসের জর্জ ফাসবিন্ডার বিবিসিকে বলেন, ‘আমি এটা নিশ্চিতভাবে বলতে চাই না যে কবরটি রাজা গিলগামেশেরই। তবে আমরা যা খুঁজে পেয়েছি তা গিলগামেশ মহাকাব্যের বিবরণের সঙ্গে মিলে যায়।’

 

গিলগামেশ মহাকাব্য ছিল মাটির ফলকে লেখা। আর তাতে লেখা আছে, গিলগামেশকে সমাহিত করা হয়েছিল ইউফ্রেটিসের তলে। তার মৃত্যুতে ইউফ্রেটিস বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল আর সেখানেই নির্মিত হয়েছিল গিলগামেশের সমাধি। জর্জ ফাসবিন্ডারের কথায়, ‘আমরা এমন একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছি, যা একসময় ছিল ইউফ্রেটিসের মধ্যভাগ। এখানে যেসব স্থাপনা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে সমাধি হিসেবেই অনুমান করা হচ্ছে।’

 

এসব স্থাপনা ছিল ইরাকি মরুভূমির তলায়। এগুলো খুঁজে পেতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের সহায় ছিল আধুনিক প্রযুক্তি। মাটিতে চৌম্বকীয় আকর্ষণের মাত্রার হেরফের থেকে খুুঁজে পাওয়া যায় এ সমাধিগুলো। মাটির তৈরি ইট ও পলিমাটির চৌম্বকীয় প্রভাবের তারতম্য থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মরুর বালির তলায় স্থাপনা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হন। ম্যাগনেটোগ্রাম থেকে পুরো উরুকের নগর পরিকল্পনাটি ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। আর এ আবিষ্কারের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশটি হচ্ছে গিলগামেশ মহাকাব্যে বর্ণিত স্থাপনা খুঁজে পাওয়া। মহাকাব্যে বর্ণিত বাগান, এমনকি মাঠের নিশানাও পাওয়া গেছে।


এ জাতীয় আরো খবর