বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২০

এক কিংবদন্তির প্রয়াণ

  • Abashan
  • ২০২০-০১-১৪ ১৭:৪৪:৩৩
image

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মহীরুহ স্যার ফজলে হাসান আবেদ প্রকৃতির নিয়মে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা জানি গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আলোর পথ দেখাবার এক আলোকবর্তিকার নাম ফজলে হাসান আবেদ। এই নাম শুধু বাংলাদেশের দরিদ্র জনপদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার নাম নয়, বিশ্বের দরিদ্র, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগুলোর উন্নয়নের নামের সমার্থক। বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি সাহায্য সংস্থা 'ব্র্যাক' একজন বাংলাদেশির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং গোটা বিশ্বে তার পরিচিতি, এই বিষয়টি চিন্তা করতেই একজন বাঙ্গালী হিসেবে গর্বে বুক ভরে ওঠে। আমি এই সংস্থার একজন গর্বিত সদস্য। এই সংস্থায় যোগদানের পূর্বেই পরিচিত এই সংস্থার সাথে। বাঙ্গালী হিসেবে কে না পরিচিত এই সংস্থার সাথে? বাংলার গ্রাম-গঞ্জ, শহর, পিছিয়ে পড়া, এগিয়ে যাওয়া যে এলাকায়ই আপনি যান না কেন, দেখবেন ব্র্যাকের অফিস। এদেশের মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এই সংস্থা, কথায় নয় কাজেই।

 

২০০৬ সালে জাতিসংঘের ডেভেলপমেন্টের প্রধান আবেদ ভাইকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদক দেওয়ার সময় বলেছিলেন 'ফজলে হাসান আবেদের মতো মাত্র ছয়জন রাষ্ট্রপ্রধান থাকলে পৃথিবীর খাদ্যের অভাব দূর হয়ে যেত।' এভাবে স্যার ফজলে হাসান আবেদের জ্ঞান, সাহস, মানবতা ও বিচক্ষণতার জন্য পৃথিবীর অনেক সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও রাষ্ট্রপ্রধান তাকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

 

আফগানিস্তান যখন ভয়াবহ যুদ্ধ চলছিল তার মধ্যে পৃথিবীর অনেকেই তাদের কাছে আসেনি অথচ এই ব্যক্তি সাহস করে সেখানে স্বাস্থ্যসেবার গুরুদায়িত্ব হাতে নিয়ে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করেছেন। স্যার ফজলে হাসান আবেদের বড় একটি স্বপ্ন হচ্ছে, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার আরও কমানো। তিনি বলেছেন, 'বাংলাদেশের সহজাত সুবিধা হলো, এখানকার মানুষগুলো বুদ্ধিমান। এদের যদি একটু ভালো শিক্ষার সুযোগ দেয়া যায়, তাহলে আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারতাম। পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে, যেসব দেশের মানুষ এতটা বুদ্ধিমান নয়। আমাদের লোকগুলো বেশি সুযোগ পায়নি কিন্তু তাদের মেধা আছে, বুদ্ধি আছে। এদের একটু সুযোগ দিলে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পরিচিতি পেত।’ এদেশের মানুষ ও তাদের সুপ্ত প্রতিভার প্রতি ছিল তার অগাধ বিশ্বাস আর সেই বিশ্বাসই তাকে সহায়তা করেছে গোটা পৃথিবীর বুকে ব্র্যাকের মতো এক প্রতিষ্ঠান গড়ে বাংলাদেশকে পরিচিত করাতে।

 

শিক্ষা যে শুধু বই পড়া, পাস করা আর সার্টিফিকেট নেওয়া নয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ব্র্যাক ‘শিক্ষা কর্মসূচি’। আমরা অলিতে গলিতে এখন কিন্ডারগার্টেন কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখতে পাই কিন্তু দুর্গম পাহাড়, হাওড় ও নদীবহুল অঞ্চলে যেখানে মাইলের পর মাইল হাঁটলেও কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া যেতো না, যেখানে গড়ে ওঠেনি কিন্ডারগার্টেন। ঐসব এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য ব্র্যাক তৈরি করেছে 'ওয়ান রুম স্কুল' যেটি দরিদ্র বিশ্বে শিক্ষার রোল মডেল। এখানে একজন শিক্ষিকা যিনি সব বিষয় পড়ান আর তাদের প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সাথে থাকেন আর তাদের শেখান দলীয় কাজ, গান, নৃত্য, জাতীয় সঙ্গীত, গল্প বলা, নিজের পরিচয় দেয়া,মানবিকতা, ন্যায়নীতি ও সত্যের পথে চলা। শিক্ষার আলো উন্নতি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরি করতে সক্ষম।

 

আবেদ ভাই তাই বলেছেন, শিশুদের ছোট্ট বয়স থেকে খেলার মাধ্যমে শিক্ষার আনন্দ বোঝানো সম্ভব। তাতে তারা বড় হয়ে আরও আগ্রহী হবে। ব্র্যাক বাস্তভিটা পরিত্যক্ত ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত তিন থেকে পাঁচ বছরের রোহিঙ্গা শিশুদের খেলার মাধ্যমে শিক্ষার প্রক্রিয়ায় নিয়ে এসেছে । শরণার্থী শিবিরে অনেক স্কুল করে তাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করছে। এক কোটি ২০শিশু প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্কুল থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করেছে। বাংলাদেশ, উগান্ডা ও তানজানিয়ায় ব্র্যাক ৬৫৬টি প্লে-ল্যাব বা খেলার মাধ্যমে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে প্রতিদিন এগার হাজার ৫০০ শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছে। হাওড় এলাকার ৫৪টি উপজেলার ১৬টি জেলায় ২০১১ সাল থেকে ৬০৫ টি বোট স্কুল বা শিক্ষা তরী পরিচালনা করছে। এসব এলাকার শিশুরা থাকতো শিক্ষা বঞ্চিত।

 

তাদের হাটিতে হাটিতে গিয়ে শিক্ষা তরীতে নিয়ে আসা, শিক্ষকদের নিয়ে আসার মতো উদ্ভাবনী পন্থার নায়ক স্যার ফজলে হাসান আবেদ। এসব এলাকার সুবিধা ও শিক্ষা বঞ্চিত শিশু ও অভিভাবকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে এই নামটি। মাধ্যমিক শিক্ষায় ব্র্যাকের অবদান দেশের আপামর জনসাধারণ হয়তো জানে না তবে বিশাল এক অংশ এর সুবিধাভোগী। গোটা দেশে যখন সিলেবাস, কারিকুলাম পরিবর্তন হলো ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে, তখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা সমুদ্রে পড়ে যান কারণ নতুন সিলেবাসে বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান কারিকুলামে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছিল বৈশ্বিক পরিবর্তনের সাথে মিল রেখে। অথচ আমাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের সেরকম পরিচিতি ছিল না এসব বিষয়ের উন্নত ও নতুনভাবে সংযোজিত চ্যাপ্টারগুলোর সাথে।

 

রাষ্ট্রের তরফ থেকেও তাদের জন্য কোনো বিষয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি, শুধুমাত্র ইংরেজিতে করা হয়েছিল তাও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সেই পরিস্থিতিতে ব্র্যাক এগিয়ে এলো এসব শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করার কাজে অর্থাৎ শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নে। শুধু তাই নয়, এসব শিক্ষকরা শুধু প্রশিক্ষণই গ্রহণ করেননি, তারা নিজেরাও হয়েছেন 'প্রশিক্ষক'। তাদের মধ্যে যে, এত প্রতিভা লুকিয়েছিল তা তারা নিজেরাই জানতেন না। ফজলে হাসান আবেদ বিশ্বাস করতেন যে, এদেশের মানুষের রয়েছে প্রতিভা, রয়েছে মেধা, শুধু সুযোগের জন্য তারা তা প্রকাশ করতে পারেনি।

 

এক লাখ কর্মী নিয়ে পৃথিবীর এগারটি দেশে ১২০ মিলিয়ন মানুষকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছে ব্র্যাক। শুধু শিক্ষা আর নারীর ক্ষমতায়ন নয়, সমাজ গঠনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো খাতেই রয়েছে ব্র্যাকের পদচারণা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, শিক্ষা, কৃষি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, সমন্বিত উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোগ বিনিয়োগ, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, আইনি সহায়তা প্রদান ব্র্যাকের কাজের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র। এ ছাড়াও আড়ং ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা তো আমরা সবাই জানি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম কুড়াতে সক্ষম হয়েছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় করার উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে এমন শিক্ষিত মানুষ তৈরি করা যারা দরিদ্রদের নিয়ে কাজ করবে, সমাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।শিক্ষা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা, সিভিল সার্ভেন্টদের ডিগ্রি দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়া। নারীর ক্ষমতায়নের কথা অনেকেই মুখে বলি, আলোচনা করি, সভা সমাবেশ করি কিন্তু এই ভিশনারী লিডার নারীর ক্ষমতায়নকে সভা সেমিনারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীরাই বেশি বৈষম্য ও অবহেলার শিকার। তাদের ক্ষমতায়নে ব্র্যাক পালন করছে অগ্রণী ভূমিকা। ব্র্যাকই প্রথম নারীদের গাড়ী চালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সমাজের অসহায় নারী যারা নতুনভাবে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, ঢাকার রাস্তায় গাড়ী চালাচ্ছে যে মেয়েটি সে তার বাড়ীর আঙ্গিনা বা কোনো আত্মীয়ের বাড়ী ছাড়া কোথাও তার পদচারণা ছিল না, সে আজ দক্ষ ড্রাইভার।

 

সামাজিক নেতৃত্বের প্রতীক বিশাল এই মহীরুহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্নভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তাঁর কর্মের, তাঁর ধ্যানের।১৯৮০ সালে ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, ২০০৭ সালে ব্র্যাক রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক 'স্বাধীনতা পুরস্কার পান। দারিদ্র বিমোচনে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবেদ ভাইকে ২০১০ সালে ব্রিটেনের অন্যতম সম্মানজনক 'নাইট' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ২০১১ সালে ওয়াইজ প্রাইজ অব এডুকেশন পুরস্কার, ২০১৩ সালে হাঙ্গেরির সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রদত্ত ওপেন সোসাইটি প্রাইজ পান। ২০১৪ সালে লিও তলস্তয় আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক ও ২০১৪ সালে স্পেনের সর্বোচ্চ বেসামরিক নাগরিক সম্মাননা অর্হার অব সিভিল মেরিট পান আবেদ ভাই। ২০১৫সালে বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার, ২০১৬ সালে পান টমাস ফ্রান্সিস জুনিয়র মেডেল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথ পদক যা বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান এবং দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য।

 

২০১৮ সালে প্রাক-শৈশব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসাধারণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ লেগো ফাইন্ডেশন, ডেনমার্কের লেগো পুরস্কার পান আবেদ ভাই। ২০১৯ সালের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে কয়েক দশকব্যাপী অনবদ্য ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ নেদারল্যান্ডসের নাইটহুড অফিসার ইন দ্য অর্ডার অব অরেঞ্জ নাসাইে খেতাবে ভূষিত হন আবেদ ভাই এবং এ বছর শিক্ষা উন্নয়ন বিষয়ে অত্যন্ত মর্যাদাসূচক এবং অর্থমূল্যের দিক থেকে সবচেয়ে বড় পুরস্কার ইদান প্রাইজ লাভ করেন তিনি।

 

এই সংস্থায় যারা চাকরি করেন বা করেছেন তারা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত শুধু শেখা ও জানার মধ্যেই থাকেন, সেটি দেশে হোক আর বিদেশের ব্র্যাক কার্যালয়েই হোক। আমরা সবাই জানি, কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা প্রাপ্তি এবং তা উত্তোলন যে কত কষ্টের কাজ আমাদের দেশে। অথচ আমাদের দেশের মধ্যেই এই সংস্থায় যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে এই বিষয়টির ডিলিং যে কত স্বচ্ছ তা বাইরের কেউ বুঝতে পারবেন না। আবেদ ভাইয়ের দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আমাদের এই সমাজে এত পজিটিভ কালচার গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে ব্র্যাকে, ব্র্যাক সংশ্লিষ্ট অন্য সবখানে এবং ব্র্যাকের কর্মীদের মাঝে। ভাল থাকবেন ওপারে আবেদ ভাই।


এ জাতীয় আরো খবর