শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২০

কোটি মানুষের জীবন বদলে দেয়া ফজলে হাসান আবেদ

  • Abashan
  • ২০২০-০১-১৪ ১৭:৩৯:২৩
image

কোনো কোনো ঘটনা একজন মানুষকে বদলে দেয়। কোনো কোনো মানুষ ইতিহাসকে বদলে দেয়। স্যার ফজলে হাসান আবেদ ইতিহাস বদলে দেয়া একজন মানুষ। আর তাঁকে বদলে দিয়েছিল ৭০এর ঘূর্ণিঝড়। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে বহুজাতিক কোম্পানি শেল’এ যোগ দেন। ৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানের হেড অব ফিন্যান্স। ৭০এর ঘূর্ণিঝড়ে লাখো মানুষের মৃত্যুর খবরে প্রাণ কেঁদে ওঠে তাঁর। এ সময় তিনি বন্ধুদের নিয়ে ‘হেল্প’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মনপুরায় ত্রাণ কার্যক্রম চালান। মনপুরায় মৃত্যু, মানুষের দুর্দশা, অসহায়ত্বই আসলে বদলে দিয়েছিল তার জীবন, দৃষ্টিভঙ্গি।

 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি চাকরি ছেড়ে ফিরে যান ইংল্যান্ডে। সেখানে তিনি ৭০এর ঘূর্ণিঝড়ের ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য গঠন করা ‘হেল্প’কে সম্প্রসারিত করে গঠন করেন ‘হেল্প বাংলাদেশ’, সাথে গঠন করেন ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’। লন্ডনে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেন এবং তহবিল সংগ্রহ করেন। কলকাতা এসে সে তহবিল দিয়ে যান প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের কাছে।

 

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন ফজলে হাসান আবেদ। দেশে ফিরে তিনি নিজের এলাকা সিলেটে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ দেখছিলেন। তার মাথায় ছিল ৭০এর ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত মনপুরা। চোখের সামনে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ। ঘুরতে ঘুরতে সুনামগঞ্জের শাল্লায় গিয়ে বদলে যায় তার জীবনের লক্ষ্য। তিনি সিদ্ধান্ত নেন; দরিদ্র, অসহায়, সবহারানো মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে তাঁর কাজ। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়তে গঠন করেন বাংলাদেশ রিহেবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি, সংক্ষেপে ব্র্যাক। পরের বছর মানে ১৯৭৩ সালে সংগঠনের নাম বদলে করা হয়- বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি। তবে ‘ব্র্যাক’ নিজেই এখন একটি আলাদা ব্র্যান্ড হয়ে গেছে।

 

বাংলাদেশ এমন অনেক স্বপ্ন সংগঠন হয়, অনেক স্বপ্ন ঝড়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সমান বয়সী ব্র্যাক যে আজ মহীরুহ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও, ব্র্যাক যে আজ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের ১১টি দেশের ১২ কোটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে; তার কৃতিত্ব স্যার ফজলে হাসান আবেদের। তিনি দারিদ্রমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। চেয়েছিলেন নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষের সমতা, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দূর করতে চেয়েছিলেন দারিদ্র্যের আঁধার দূর করতে। আরো অনেকের মতো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেননি। স্বপ্ন সত্যি করতে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তার দূরদর্শিতা, অঙ্গীকার, দেশপ্রেমই ব্র্যাককে আজকের জায়গায় এনেছে।

 

ব্র্যাক গঠিত হয়েছিল দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে। কিন্তু সেই আবেগের সাথে দক্ষতার নিপুণ মিশেল ঘটাতে পেরেছিলেন ফজলে হাসান আবেদ। পেরেছিলেন বলেই তার বিদায়েও ব্র্যাক মুষড়ে পড়ে না। বরং তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করে।

 

ছেলেবেলায় গ্রামে দেখতাম ঘরে ঘরে সূচিকর্মে একটা কবিতার কয়েকটি চরণ লেখা থাকতো, ‘যেদিন প্রথম তুমি, এসেছিলে ভবে। তুমি মাত্র কেঁদেছিলে, হেসেছিল সবে। এমন জীবন হবে করিতে গঠন। মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন।‘ স্যার ফজলে হাসান আবেদ তেমনই একটি জীবন গড়েছিলেন। ৮৩ বছরে তাঁর জীবনের পেয়ালা কানায় কানায় পূর্ণ। এমন পূর্ণ জীবন আমাদের ঈর্ষান্বিত করে। অনুকরণীয় জীবন, কিন্তু আসলে অনুকরণযোগ্য নন তিনি।

 

তার মত এমন করে ভাবতে পারা, স্বপ্ন দেখতে পারা, সংগঠন গড়তে পারার সামর্থ্য কয়জনের আছে। তাই চাইলেও ফজলে হাসান আবেদ হওয়া যায় না। ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে বুঝে গিয়েছিলেন সময় ফুরিয়ে আসছে। তাই তার হাতে গড়া সব প্রতিষ্ঠানে উত্তরাধিকার বসিয়ে, দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এমন সৌভাগ্য কয়জনের হয়। ফজলে হাসান আবেদ জানতেন নিছক সমাজসেবা দিয়ে সংগঠন টিকিয়ে রাখা যাবে না। তাই গড়ে তুলেছিলেন বাণিজ্যিকভাবে সফল অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান। ব্র্যাকের অর্থনৈতিক ভিত্তি খুব শক্ত। তাই ফজলে হাসান আবেদ চোখ বুজলেই ব্র্যাক ধ্বসে পড়বে এমন আশঙ্কা কেউ করেনি। বরং ফজলে হাসান আবেদের দেখানো পথে নতুন প্রজন্ম আরো দক্ষতা ও স্মার্টনেসের সাথে ব্র্যাককে আরো এগিয়ে নেবে, এমনটাই সবার প্রত্যাশা।

 

ফেসবুকে ফজলে হাসান আবেদের শোক সংবাদে কয়েকটি মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়া দরকার। কয়েকজন ফজলে হাসান আবেদকে ‘সুদখোর’ বলেছেন। দাবিটি মিথ্যা নয়। ব্র্যাক ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করতো এবং নিশ্চয়ই সুদও নিতো। ব্র্যাক ব্যাংকও নিশ্চয়ই সুদ নিয়ে ঋণ বিতরণ করে। ঋণ নিলে আপনাকে সুদ দিতে হবে। এটাই নিয়ম।

 

ফজলে হাসান আবেদ লঙ্গরখানা বা দানছত্র খোলেননি। তবে তিনি ঋণ দিয়ে মানুষের জীবন বদলাতে চেয়েছিলেন এবং কোটি মানুষের জীবন বদলাতে পেরেছিলেন। ব্র্যাক শুধু ঋণ দিয়ে আর সুদ নিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি। ঋণ দেয়ার পর গ্রহীতা যাতে সেটা কাজে লাগাতে পারে, ছোট ব্যবসা করতে পারে; তার জন্য ঋণগ্রহীতার পাশে থেকেছে। ফজলে হাসান আবেদ অবশ্যই একজন সুদখোর। শুধু তিনি নন, বাংলাদেশ এবং বিশ্বের সকল ব্যাংকারই সুদখোর। তবে আর সব ব্যাংকারের সাথে ফজলে হাসান আবেদের পার্থক্য হলো; তার কাছে ব্যবসাটা মূল ছিল না; দারিদ্র্য বিমোচন, মানুষের কল্যাণই ছিল তার লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই তিনি অবিচল ছিলেন আজীবন।

 

আরেকজন লিখেছিলেন, ফজলে হাসান আবেদ ও তাঁর বন্ধুরা বাংলাদেশের বাম আন্দোলন পঙ্গু করে দিয়েছেন। এই অভিযোগও পুরো মিথ্যা নয়। তবে আমার মনে হয়, বামরা নিজেদের ব্যর্থতার দায় ফজলে হাসান আবেদের কাঁধে চাপাতে চাইছেন। বাংলাদেশের বাম আন্দোলন পঙ্গু হয়েছে বাম নেতাদের ব্যর্থতা আর জনবিচ্ছিন্নতায়। এখানে ফজলে হাসান আবেদকে দায় দিয়ে লাভ নেই। আর ফজলে হাসান আবেদ তো কখনোই সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, তেমন দাবিও কখনো করেননি। তিনি জীবনভর পুঁজিবাদী ভাবধারার মানুষ ছিলেন। তবে অন্য পুঁজিবাদীদের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো, তিনি পুঁজিকে ব্যক্তির কাজে লাগাননি, সমষ্টির উন্নয়নে কাজ করেছেন জীবনভর। সমাজতন্ত্রী হোন আর পুঁজিবাদী- মানুষের কল্যাণ কামনাটাই আসল। ফজলে হাসান আবেদ সেখানে অনন্য।

 

আরেকজনের অভিযোগ, ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাককে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মত করে গড়ে তুলেছেন। পরিবারের সদস্যদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। এ অভিযোগটি আংশিক সত্য। তবে ফজলে হাসান আবেদ কখনোই বিলাসী জীবনযাপন করেননি। ব্র্যাক থেকে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হননি। আর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনে পারিবারিকীকরণ নেই? ফজলে হাসান আবেদ তো মঙ্গল গ্রহ থেকে আসেননি। এই বাংলাদেশের যে প্রবণতা, তিনিও তার বাইরে নন। কিন্তু তাঁর পরিবারের যাদের দায়িত্ব দিয়েছেন; তারা যোগ্য কিনা, দক্ষ কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা কথা হতে পারে। তবে সেটা বলে দেবে ভবিষ্যৎ। ফজলে হাসান আবেদের অনুপস্থিতিতে তার উত্তরসূরিরা ব্র্যাককে এগিয়ে নিতে পারেন কিনা; সেটাই বিবেচ্য। পরিবারের লোকজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলেই খারাপ, ব্যাপারটা এমন নাও হতে পারে।

 

স্যার ফজলে হাসান আবেদের অর্জন আকাশসম। কিন্তু তিনি যাপন করেছেন মাটিসংলগ্ন জীবন। তাঁর অর্জনের তালিকা দিলে এই লেখার আয়তন বাড়বে। বলা যায় নোবেল ছাড়া আর সব পুরস্কার ও সম্মাননাই তিনি পেয়েছেন। কিন্তু আমার বিবেচনায় তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তাঁর উদ্যোগে বদলে যাওয়া মানুষের জীবন। একেকটি জীবন একেকটি পদক। ৪৭ বছরে বিশ্বজুড়ে এমন কোটি কোটি পদক আছে তার ঝুলিতে। কিন্তু বরাবরই তিনি ছিলেন প্রচারের আড়ালে। কোনোদিন কোনো বিতর্কে জড়াননি। এমন পূর্ণাঙ্গ জীবন খুব দেখা যায় না।

 

ফজলে হাসান আবেদের মত সময় বদলে দেয়া, যুগ বদলে দেয়া, ইতিহাস বদলে দেয়া মানুষ খুব বেশি আসে না। এইরকম মানুষদেরই বলা হয় ক্ষণজন্মা। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। জাতি অপেক্ষায় থাকবে, আবার কবে একজন ফজলে হাসান আবেদ জন্মাবেন, পৃথিবীকে আরো উন্নত, বাসযোগ্য ও বৈষম্যহীন করতে কাজ করবেন


এ জাতীয় আরো খবর