মঙ্গলবার, আগস্ট ১১, ২০২০

শব্দদূষণ : রাজধানীর ১১.৮% ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত

  • Abashan
  • ২০২০-০১-১২ ১০:৫৮:৩৪
image

ঢাকামেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি)পাঁচটি বিভাগের মধ্যে একটিহলো ট্রাফিক বিভাগ। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তীব্র শব্দদূষণে এ বিভাগের ১১দশমিক ৮ শতাংশ সদস্যের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্র (ক্যাপস)ও বাংলাদেশ পরিবেশআন্দোলনের (বাপা)যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একগবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল ঢাকারিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ)‘তীব্র শব্দদূষণের কবলেঢাকাবাসী’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদসম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে শব্দদূষণের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন বাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিবাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপারনির্বাহী সহসভাপতি ডা. মো.আব্দুল মতিন ও সঞ্চালনাকরেন সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্টামফোর্ডবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকী, পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ারইমতিয়াজ হাশমী। আরো উপস্থিত ছিলেন বাপার নির্বাহী সদস্য ইবনুল সাইদ রানা এবং জাতীয়কমিটির সদস্য তোফায়েল আহমেদ।

গবেষণা জরিপেরাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার ১১০ জন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য অংশ নেন। এলাকাগুলো হলোধানমন্ডি, সায়েন্সল্যাব, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী,শাহবাগ ও মতিঝিল। ২০১৮সালের ১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ জরিপ চালানো হয়।

জরিপ থেকে পাওয়াতথ্যে দেখা যায়, শব্দদূষণে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশেরশ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ জানায়, সাধারণভাবে মোবাইলে কথা শুনতে তাদের অসুবিধা হয়। ১৯ দশমিক ১ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানায়, ঘরের অন্য সদস্যদের তুলনায় বেশি ভলিউম দিয়ে তাদেরটিভি দেখতে হয়। আর ৩৩ দশমিক ৯ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানায়, অন্যরা উচ্চস্বরে কথা না বললে তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়।এদিকে ৮ দশমিক ২ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানায়,কয়েক ঘণ্টা দায়িত্ব পালনেরপর তারা ঘূর্ণিরোগ, মাথা ভনভন করা, বমি বমি ভাব ওক্লান্তির সমস্যায় ভোগেন।

বাপার যুগ্মসাধারণ সম্পাদক বলেন, শব্দদূষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন ট্রাফিকপুলিশ সদস্যরা। তারা কিন্তু দায়িত্ব ছেড়ে কোথাও যেতে পারেন না। দেশে শব্দদূষণের ৮০ভাগ হয় যানবাহন থেকে। আর যানবাহনের হর্ন কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের কানের দুই কিংবাতিন ফুটের মধ্যে বাজে। এ কারণেই ট্রাফিক পুলিশদের নিয়ে আমরা গবেষণাটি করেছি। আমরাতাদের শ্রবণমান নিয়েও গবেষণা করব। আমরা পুলিশের অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছি। আমরাবলেছি, কোনো ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে যেন কোনো এলাকায় টানা৩ ঘণ্টার বেশি দায়িত্ব পালন করতে না দেয়া হয়।

জরিপে বলা হয়, শব্দদূষণের কারণে আগামী প্রজন্ম মানসিক ও শারীরিকভাবে বেশিক্ষতিগ্রস্ত হবে। শ্রবণশক্তি হ্রাস,বধিরতা, হূদরোগ,মেজাজ খিটখিটে হওয়া, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্ন হওয়াসহ নানা রকম সমস্যা দেখাযায়। স্বল্পমেয়াদি শব্দদূষণ মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণশ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। শ্রবণশক্তি হ্রাসের ফলে বিরক্তি, নেতিবাচকতা,রাগ, ক্লান্তি,চাপা উত্তেজনা, মানসিক চাপ,বিষণ্নতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিহার, ব্যক্তিগত ঝুঁকিবাড়ায় এবং স্মৃতিশক্তি ও নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

যুক্তরাষ্ট্রেরন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারমতে, ৮৫ ডেসিবেল শব্দের সর্বোচ্চ অনুমোদনীয় স্থিতিকাল (প্রতিদিন)৮ ঘণ্টা। ১০০ ডেসিবেলশব্দের সর্বোচ্চ অনুমোদনীয় স্থিতিকাল(প্রতিদিন) ১৫ মিনিট। ১২০ ডেসিবেল শব্দের সর্বোচ্চ অনুমোদনীয় স্থিতিকাল (প্রতিদিন)৯ সেকেন্ড। ১২০ ডেসিবেলশব্দ সম্পূর্ণ বধিরতা সৃষ্টি করতে পারে। শব্দদূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার ২০১৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী,বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার২০ শতাংশের শ্রবণশক্তি লোপ পেয়েছে,যার মধ্যে ২৬ শতাংশই শিশু।পরিবেশ অধিদপ্তরের দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে শব্দের মাত্রা পরিমাণবিষয়ক একটি জরিপকরে দেখা গেছে, সব স্থানেই শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করেছে।

গত ১৭ ডিসেম্বরসচিবালয় এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে বন, পরিবেশ ও জলবায়ুমন্ত্রণালয়। এ ঘোষণার পরও সচিবালয় এলাকায় হর্ন বাজানো হচ্ছে। ক্যাপসের গবেষণা দলঢাকা শহরে ৭০টি এলাকায় শব্দদূষণ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, নীরব,আবাসিক ও মিশ্র এলাকারক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা শতভাগ সময় আদর্শ মানের উপরে ছিল (নীরব এলাকার আদর্শমান ৫০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকার আদর্শমান ৫৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকার আদর্শমান ৬০ ডেসিবেল)। ঢাকা শহরের পাশাপাশিঅন্যান্য শহরে শব্দদূষণের ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে। এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারেএজন্য কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেছে তারা।

অধ্যাপকমুহাম্মাদ আলী নকী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ ধরনের জাতীয়গণগুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।

পুরো বিষয়টিনিয়ে গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ড.আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারবণিক বার্তাকে বলেন, আমরা যখন কোনো দূষণ নিয়ে কাজ করি, তখন সরকারি দপ্তর কিংবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন, তাদের কাজে আমরা হস্তক্ষেপ করছি। কিন্তু আমরা যে কাজ করছি, তার যে তথ্য-উপাত্ত সেগুলো তাদের কাজে সহযোগিতা করবে। যেহেতুপরিবেশ অধিদপ্তরের নিজস্ব গবেষণার সক্ষমতা অনেক সময় থাকে না, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ করতে পারে না। আমাদের এ তথ্যগুলোজাতীয় ডাটাবেজ সেন্টারে যোগ হবে।


এ জাতীয় আরো খবর